সোনা-রুপার চেইন, ক্রস বা অন্য কোনো পেনড্যান্ট কিংবা কানের দুল—একসময় ফুটবলাদের পরিচয়েরই অংশ ছিল। বিশ্বকাপের মঞ্চেও ছিল সেই সিগনেচার স্টাইলের ছাপ। অথচ আজ সেগুলো প্রায় উধাও। কেন বদলে গেল এই স্টাইল?
যখন গয়নাই ছিল ফুটবল কিংবদন্তিদের সিগনেচার
ষাট থেকে নব্বই দশক—ফুটবলের সেই সোনালি সময়ের ছবিগুলোতে চোখ রাখলেই ধরা পড়ে এক অন্য রকম আবহ। ঢিলেঢালা জার্সি, কাদায় মাখা শরীর, গোটানো হাতা আর গলার কাছে চিকচিক করা চেইন। কারও গলায় সেই চেইনে ছোট্ট একটি ক্রস, কারও নিজের নামের প্রথম অক্ষর খোদাই করা পেনড্যান্ট, আবার কারও কানে দুল। এগুলো তখন শুধু গয়না ছিল না, বরং ছিল খেলোয়াড়দের ব্যক্তিত্ব ও স্টাইলেরই অংশ।


ফুটবল কিংবদন্তিদের অনেকেই মাঠে নিজেদের প্রিয় অলংকার পরে খেলতেন। বিভিন্ন সময় পেলের গলায় চেইন বা ছোট পেনডেন্ট দেখা গেছে। দিয়েগো ম্যারাডোনার পরিচিত লুকের অংশ ছিল চেইন ও ক্রস।

রোনালদিনিও যখন বল নিয়ে প্রতিপক্ষকে নাচাতেন, তাঁর গলায় দুলতে থাকা চেইন যেন সেই জাদুকরি ড্রিবলিংয়েরই আরেক অনুষঙ্গ হয়ে উঠত। ডেভিড বেকহ্যামও ছিলেন অন্যতম স্টাইল আইকন।

কানে ডায়মন্ড স্টাড, গলায় চেইন আর একেক ধরনের হেয়ারস্টাইল তাঁকে মাঠের বাইরেও ফ্যাশনের ট্রেন্ডসেটার বানিয়েছিল। মারিও বালোতেল্লির কানের দুল, চেইন ও সাহসী স্টাইলও ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর।

এমনকি ২০০৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সময় তরুণ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও দুই কানে দুল পরতে দেখা গেছে।
শুধু নিয়মিত ম্যাচই নয়, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপেও এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিনেদিন জিদান হাতে বিয়ের আংটি পরে খেলেছিলেন।

তখন এসব নিয়ে তেমন প্রশ্ন উঠত না; বরং এগুলো খেলোয়াড়দের নিজস্ব পরিচয়েরই অংশ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ শুরুর আগে রেফারিরা খেলোয়াড়দের অনুষঙ্গ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। গলায় চেইন, হাতে ব্রেসলেট কিংবা কানে দুল থাকলে তা খুলে ফেলতেই হয়। ফলে একসময় ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য স্টাইল-স্টেটমেন্ট হয়ে থাকা সেই ঝলমলে গয়নাগুলো এখন কেবল পুরোনো ছবি আর স্মৃতিতেই আটকে আছে।
নিরাপত্তার জন্য বদলে যায় নিয়ম
১৯৯৭ সালে লজ অব দ্য গেম-এর বড় সংশোধনের সময় খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে গুরুত্ব পায়। এরপর ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) ৪ নম্বর ধারায় (দ্য প্লেয়ার্স ইকুইপেমন্ট) গয়না ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা আরও পরিষ্কার ও কঠোর করে। বর্তমান আইনে বলা হয়েছে, খেলোয়াড়েরা এমন কোনো গয়না বা সরঞ্জাম পরে মাঠে নামতে পারবেন না, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নেকলেস, আংটি, ব্রেসলেট, কানের দুলসহ যেকোনো ধরনের গয়না খুলে ফেলতে হয়।

এমনকি টেপ দিয়ে ঢেকে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। ম্যাচ শুরুর আগে রেফারিরা খেলোয়াড় ও বদলি খেলোয়াড়দের সরঞ্জাম পরীক্ষা করেন। কারও গায়ে নিষিদ্ধ গয়না থাকলে সেটি খুলে ফেলতে বলা হয়। নির্দেশনা না মানলে তাঁকে মাঠের বাইরে যেতে হতে পারে এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে শাস্তির মুখেও পড়তে পারেন। এই কড়াকড়ির কারণ একটাই—নিরাপত্তা। একটি চেইন প্রতিপক্ষের শরীরে আটকে গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে। আংটি আঙুলে চোটের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার কানের দুল ছিঁড়ে গিয়ে কানের লতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, ফুটবল এখন অনেক বেশি বডি-কন্ট্যাক্ট গেমে পরিণত হয়েছে। ফলে সৌন্দর্যের চেয়ে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেফারির চোখ ফাঁকি দেয়নি কুন্দের চেইনও

কঠোর নিয়মের পরও মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ডিফেন্ডার জুলস কুন্দে প্রায় আধঘণ্টা গলায় চেইন পরে খেলেছিলেন। পরে সহকারী রেফারির নজরে বিষয়টি আসতেই খেলা থামিয়ে তাঁকে সেটি খুলতে বলা হয়। মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অন্য খেলার আলাদা নিয়ম
সব খেলায় অবশ্য একই নিয়ম নেই। বেসবলে অনেক খেলোয়াড়কে মাঠেই চেইন পরে খেলতে দেখা যায়। বাস্কেটবল বা কিছু আইস হকি লিগেও ছোট চেইন বা ব্যক্তিগত অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখা যায়। তবে বক্সিং, এমএমএ এবং ভলিবলের মতো খেলায় নিরাপত্তার কারণে ম্যাচ চলাকালে গয়না পরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফুটবলে এই নিয়ম সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয়।
স্টাইল এখন মাঠের বাইরে

ম্যাচে গয়না না পরলেও আধুনিক ফুটবলারদের স্টাইল থেকে গয়না একটুও হারিয়ে যায়নি। বরং এখন তা আরও বেশি দৃশ্যমান। দলীয় বাসে ওঠা, স্টেডিয়ামে পৌঁছানো, ওয়ার্মআপের ছবি, ড্রেসিংরুমের মুহূর্ত, ফ্যাশন ফটোশুট, ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন, পডকাস্ট, সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চেইন, আংটি, ব্রেসলেট কিংবা বিলাসবহুল ঘড়ি এখন ফুটবলারদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। অনেক তারকা বিভিন্ন জুয়েলারি ব্র্যান্ডের প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। নেইমার, লামিনে ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো ডি পল , এনসো ফার্নান্দেজ এই তালিকায় বেশ ওপরের দিকে আছেন। মাঠের বাইরে জমকালো চেইন, আংটি আর ঘড়ির জন্য পরিচিত এই তাঁরা। অর্থাৎ, গয়না এখনো তাঁদের ব্যক্তিত্বের অংশ, শুধু ম্যাচের ৯০ মিনিট সময় বাদ দিয়ে।

আধুনিক ফুটবল নিঃসন্দেহে আরও দ্রুত, নিরাপদ, কৌশলগত এবং পেশাদার। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য গয়না নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতাও স্পষ্ট, আর নিরাপত্তার সঙ্গে আপসের সুযোগ নেই। তবু পুরোনো ম্যাচের ভিডিওতে যখন কোনো তারকার গলায় চেইন, পেনড্যান্ট কিংবা দুলের ঝিলিক ধরা পড়ে, তখন অনেক ফুটবলপ্রেমীই হয়ে পড়েন নস্টালজিক।

হয়তো গয়নাটি নয়, বরং সেই সময়ের ফুটবল, সেই নির্ভার ব্যক্তিত্ব আর মাঠের মানবিক গল্পগুলোকেই তাঁরা সবচেয়ে বেশি মিস করেন।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম








