দিন দিন যেন তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। এমন গরমের সময় রোদ এড়িয়ে চলা ও প্রচুর পানি পান করা কতটা জরুরি, তা সবাই জানি। তবে এই প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায়ও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। পুষ্টিবিদদের মতে, গরমের দিনে সঠিক খাবার বেছে নিলে তা শরীরে শক্তি জোগায় ও শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
তবে গরমের দিনে ক্ষুধা কম লাগে। কারণ, খাবার হজম করার সময় শরীরের ভেতরে বাড়তি তাপ উৎপন্ন হয়। শরীর তখন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই অতিরিক্ত তাপ উৎপাদন কমাতে চায়। ২০১৮ সালে ‘পিএলওএস বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে একধরনের তাপসংবেদী প্রোটিন থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে এই প্রোটিনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কোনো কিছু না খেলেও পেট ভরা থাকার একটি কৃত্রিম অনুভূতি তৈরি করে।
তবে ক্ষুধা কম লাগলেও অন্য ঋতুর মতোই গরমের দিনেও শরীরের পুষ্টির চাহিদা কিন্তু একই থাকে। তাই এ সময়ে শুধু নিয়ম মেনে খাওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সঠিক খাবার বেছে নেওয়া জরুরি। খাদ্যতালিকায় এমন খাবার রাখা দরকার, যা তাপপ্রবাহের কারণে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি, ইলেকট্রোলাইট ও অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
ইউরোপে এত গরম, তা–ও ঘরে ঘরে এসি নেই কেন
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবে
গরমে সুস্থ থাকার একটা সহজ উপায় হলো, কোন কোন খাবার খাওয়া একদম উচিত নয়, তা জেনে রাখা। এ সময়ে বেশি তেল–চর্বিযুক্ত ও ভারী খাবার তালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া ভালো। কারণ, চর্বি ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার হজম করতে আমাদের পেটের পরিপাকতন্ত্রকে অনেক বেশি খাটতে হয়। এতে শরীরের ভেতরে বাড়তি তাপ তৈরি হয়, যা শরীরকে আরও গরম করে তোলে। এতে আমাদের অলস ও ক্লান্তি লাগে। তাই গরমে শরীরকে সতেজ ও ঠান্ডা রাখতে ভারী খাবারের বদলে অল্প করে হালকা খাবার খাওয়া উচিত।
তবে হালকা খাবার বেছে নেওয়ার সময়ও একটু সাবধান হতে হবে। যেমন চিপস বা প্রক্রিয়াজাত মাংসের মতো অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার শরীরে লবণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শরীর দ্রুত পানি হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে যদি তুমি ঠিকমতো পানি পান না করো।
গরম লাগলে অনেকে ঠান্ডা কোমল পানীয়, কফি বা আইসড টি খেতে পছন্দ করে। কিন্তু এগুলো আসলে শরীরের কোনো উপকারই করে না। ক্যাফেইন বা অতিরিক্ত কৃত্রিম উপাদানযুক্ত পানীয় শরীর থেকে উল্টো পানি বের করে দেয়। ফলে তৃষ্ণা কমার বদলে শরীর আরও বেশি পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া বেশি চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার বা পানীয় পরিপাক ক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করে। চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে অনেক সময় নেয়, যা শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে খাবারে অতিরিক্ত চিনি থাকলে তা শরীরের কোষ থেকে পানি টেনে নেয়। যার ফলে তৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়। তাই বোতলজাত চিনিযুক্ত পানীয় বা অতিরিক্ত আইসক্রিম না খেয়ে পানিতে সাধারণ ফলের রস মিশিয়ে ঘরে তৈরি চমৎকার পানীয় কিংবা তাজা ফলের আইসপপ বানিয়ে খাওয়া অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ও মজার।
অতিরিক্ত গরম কীভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে
যেসব খাবার খাবে
গরমে মাংসের পরিবর্তে ডিম, মাছের মতো কম চর্বির প্রোটিন খাওয়া উচিত। সবজিও প্রোটিনের ভালো উৎস। এটি সহজে হজম হয়। তবে গরমের দিনে এই খাবারগুলো খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এতে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পুষ্টিবিদদের মতে, পচনশীল খাবারগুলো ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচের তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখা উচিত। প্রচণ্ড গরমে এগুলোকে এক ঘণ্টার বেশি বাইরে ফেলে রাখা যাবে না।
গরমে আমরা কী খাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কী পান করছি। প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে খুব দ্রুত পানি বেরিয়ে যায়। সেই ঘাটতি পূরণ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণ অবস্থায় দিনে ৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করা ভালো। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলে ও বেশি ঘাম হলে পানির চাহিদাও অনেক বেড়ে যায়। তাই তৃষ্ণা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে সারা দিন ধরে অল্প অল্প করে পানি পান করা উচিত।
গরমের কারণে শরীর থেকে পানির সঙ্গে ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। ইলেকট্রোলাইট হলো এমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো কিছু খনিজ, যা পানিতে মিশে শরীরের ভেতরে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো কাজ করে।
যে রঙের পোশাক পরলে এই গরমে রক্ষা পাওয়া যাবেএগুলো আমাদের স্নায়ু ও পেশির সচলতা, পুষ্টির পরিবহন ও শক্তি উৎপাদনের মতো জরুরি কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ খাবারে ইলেকট্রোলাইট পাওয়া গেলেও গরমের দিনে শরীর থেকে এটি এত দ্রুত বের হয় যে অতিরিক্ত যত্নের প্রয়োজন পড়ে। এই ঘাটতি মেটাতে ডাবের পানি, তরমুজ বা কমলার রসের মতো প্রাকৃতিক পানীয় দারুণ সাহায্য করে।
পানি ও ইলেকট্রোলাইটের আরেকটি বড় উৎস হলো তাজা ফলমূল ও শাকসবজি। সাধারণত যেকোনো ফল বা সবজিতে প্রায় ৮০ শতাংশ পানি থাকে। এর মধ্যে তরমুজে ৯০ শতাংশ ও শসায় প্রায় ৯৭ শতাংশ পানি থাকে, যা যেকোনো খাবারের চেয়ে সর্বোচ্চ।

এ ছাড়া ফলের স্মুদি বা জুস বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে, যা আইসক্রিম বা মিল্কশেকের মতো অতিরিক্ত চিনি ও চর্বির ক্ষতি ছাড়া শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
অনেকে মনে করেন, গরমে ঝাল বা মসলাদার খাবার খাওয়া ভালো। কারণ, এগুলো ঘাম ঝরিয়ে শরীর ঠান্ডা করতে সাহায্য করে। মধ্যপ্রাচ্য বা মেক্সিকোর মতো উষ্ণ অঞ্চলের দেশগুলোয় গরমে মসলাদার খাবার খাওয়ার চল রয়েছে।
তবে ঝাল খাবার খাওয়ার আগে শরীরে পর্যাপ্ত পানি আছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে মসলাদার খাবার পেটে অস্বস্তি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সূত্র: টাইম ম্যাগাজিনগরমে খেয়াল রেখো প্রাণীদের প্রতিও







