প্রতি ১০ জন মা মোট ২৩ জন সন্তানের জন্ম দিতেন। আর এখন সেই সংখ্যাটা হয়েছে ২৪। বাড়ল মাত্র একজন, কিন্তু সেটাই বড় এক চাপ এবং ঝুঁকির আলামত হয়ে এসেছে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিপদ দেখছেন।
একটি জরিপ বলছে, দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) সামান্য বেড়েছে। অর্থাৎ মায়েদের গড় সন্তানসংখ্যা কিছু বেড়েছে।
পাশাপাশি এক দশকের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত জনবলসংকট চলছে, সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ নেই, অনেক দম্পতি প্রয়োজনের সময় তা পাচ্ছেন না।
সংকট বিশেষভাবে প্রকট হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিক থেকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলজুড়ে। এখনো সংকটগুলো দূর করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিএফআর বাড়ার পেছনে রয়েছে এসব সংকট।
মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট
একজন নারী প্রজনন বয়সে (১৫ থেকে ৪৯ বছর) যত সন্তানের জন্ম দেন, সেটাই টিএফআর। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) বলছে, দেশে টিএফআর এখন ২ দশমিক ৪। অর্থাৎ একজন মায়ের গড়ে ২ দশমিক ৪টি করে সন্তান হচ্ছে। এর আগে টিএফআর ছিল ২ দশমিক ৩।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদের মতে, এটুকু বৃদ্ধিই উদ্বেগজনক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও গভীর বিশ্লেষণ দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের একাধিক শিক্ষক তাঁদের লেখায় ও প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
টিএফআর বেড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়—এমন কথা বলেছেন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জনসংখ্যাবিষয়ক কর্মকর্তা আর গবেষকেরাও।
পাশাপাশি এক দশকের বেশি সময় ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত জনবলসংকট চলছে, সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ নেই, অনেক দম্পতি প্রয়োজনের সময় তা পাচ্ছেন না।
উদ্বেগের কারণ একাধিক। প্রথমত, এর মানে মা-প্রতি সন্তান জন্মদান বাড়ছে। দেশে প্রজননবয়সী মায়ের সংখ্যা সাড়ে চার কোটির মতো। ফলে জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত, এই প্রবণতাকে দুর্বল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আলামত বলা যায়।

এই মুহূর্তে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত ২৭ শতাংশ পদ খালি। নতুন নিয়োগ বন্ধ আছে। মাঠপর্যায়ে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সংকট প্রবল। বাজারে এসব সামগ্রীর দাম চড়া। জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড নেই। এই অবস্থা চললে টিএফআর আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
স্বাধীনতার পরের সরকারগুলো জনসংখ্যাকে দেশের উন্নয়নে বাধা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) এটাকে সবচেয়ে জটিল বাধা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বলা হয়, জনসংখ্যা বাড়ার উঁচু হার সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন বলছেন, নগররাষ্ট্রগুলো বাদ দিলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনঘনত্বের দেশ বাংলাদেশ। একটি লম্বা সময় টিএফআর না কমে স্থিতিশীল ছিল। তখনো কিন্তু জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে।
প্রথম আলোকে এই অধ্যাপক বলেন, ‘সর্বশেষ দেখা যাচ্ছে টিএফআর স্থিতিশীল অবস্থা থেকে বাড়ার দিকে। আমরা ধারণা করছি নিকট ভবিষ্যতে এই প্রবণতাই দেখা যাবে। এটা বাংলাদেশের জন্য খারাপ ইঙ্গিত বহন করে।’
দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্থবির, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীন
টিএফআর কবে কত ছিল
জনসংখ্যা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছিল মোট প্রজনন হার বা টিএফআর কমানোর মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকেই এটা কমে আসছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হালিদা হানুম আখতার স্বাধীনতার আগে ১৯৬৯ সালে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন তখনকার ফ্যামিলি প্ল্যানিং বোর্ডে। এই নারী স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতার আগে এই অঞ্চলে টিএফআর নিয়ে বড় কোনো কাজ বা জরিপ হয়নি। সুতরাং পাকিস্তান আমলে এটা ঠিক কত ছিল, তা বলা মুশকিল।
তবে বাংলাদেশ ফার্টিলিটি সার্ভে অনুযায়ী ১৯৭৫ সালে টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৩। অর্থাৎ তখন একজন মা গড়ে ছয়টির বেশি সন্তানের জন্ম দিতেন। জনসংখ্যা কর্মসূচির কারণে ১৪ বছর পর ১৯৮৯ সালে সেটা কমে হয় ৫ দশমিক ১।
মানুষের সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়তে থাকে। ১০ বছর পর ১৯৯৯-২০০০ সালে টিএফআর কমে ৩ দশমিক ৩ হয়। ২০০৪ সালে তা নেমে আসে ৩-এ। ক্রমে ২০১১ সালে টিএফআর হয় ২ দশমিক ৩। এরপর টিএফআর আর কমেনি।
মানুষের সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়তে থাকে। ১০ বছর পর ১৯৯৯-২০০০ সালে টিএফআর কমে ৩ দশমিক ৩ হয়। ২০০৪ সালে তা নেমে আসে ৩-এ। ক্রমে ২০১১ সালে টিএফআর হয় ২ দশমিক ৩। এরপর টিএফআর আর কমেনি।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপগুলো (বিডিএইচএস) বলছে, ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টিএফআর ২ দশমিক ৩ ছিল।
অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন বলেন, ‘এই লম্বা সময় ধরে টিএফআর কমল না। এর প্রচণ্ড চাপ পড়ল দেশের ওপর। তখনই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তাঁরা সতর্ক হননি। ফলে টিএফআর না কমে বা স্থিতিশীল না থেকে বরং বেড়ে গেছে। এর তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী।’
ইউনিসেফ ও বিবিএসের যৌথ এমআইসিএস অনুযায়ী ২০১২-১৩ ও ২০১৯ সালে টিএফআর ছিল ২ দশমিক ৩। এখন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এমআইসিএসে দেখা গেল সেটা শূন্য দশমিক ১ পরিমাণ বেড়েছে। ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে টিএফআর বেড়ে যাওয়ার নজির নেই।
জনস্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের তুলনায় বেশি সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি। ঘন ঘন গর্ভধারণ ও প্রসবের ফলে মায়ের রক্তস্বল্পতা ও পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়, প্রসবকালীন জটিলতায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। জরায়ু নেমে যাওয়া, ফিস্টুলা ও দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। তাঁদের সন্তানদেরও কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ এবং অপুষ্টিতে ভোগার ঝুঁকি বেশি থাকে।
অন্যদিকে সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে নারী নিজের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ হারান।
জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের (ইকোসক) জনসংখ্যা বিভাগের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টে ২০২৪ সালের প্রাক্কলন বলছে, টিএফআর আগের মতো ২ দশমিক ৩ থাকলে ২০৩১ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে হবে ১৮ কোটি ৮০ লাখ। আর ২০৩৬ সালে হবে ১৯ কোটি ৬৭ লাখ।
জনসংখ্যা কত বাড়ছে
সরকার গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে বলে আসছে, টিএফআর কমিয়ে ২ দশমিক ১ করতে হবে। ২০১২ সালের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিতেও এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ২০১৫ সালের মধ্যে তা করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
টিএফআর ২ দশমিক ১ হচ্ছে প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হার। এর অর্থ এক দম্পতির সন্তান হবে দুটি। এমনটা হলে জনসংখ্যা স্থির থাকে।
তবে সর্বশেষ ২০২৫ সালের জনসংখ্যা নীতিতে এ ধরনের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই।
অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন এই নীতি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি অবশ্য বলছেন, টিএফআর অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নীতিতে উল্লেখ করার বিষয় নয়। এটা থাকতে হবে নীতির অ্যাকশন প্ল্যান অর্থাৎ কর্মপরিকল্পনা বা কৌশলপত্রে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্রে (২০২৫-২০৩০) এর কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদএই মুহূর্তে মাঠপর্যায়ে জনবলের স্বল্পতা, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীসহ ওষুধপত্রের স্বল্পতা আছে।জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের (ইকোসক) জনসংখ্যা বিভাগের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টে ২০২৪ সালের প্রাক্কলন বলছে, টিএফআর আগের মতো ২ দশমিক ৩ থাকলে ২০৩১ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে হবে ১৮ কোটি ৮০ লাখ। আর ২০৩৬ সালে হবে ১৯ কোটি ৬৭ লাখ।
বিবিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ইউএনএফপিএসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষজ্ঞ দল জনসংখ্যা পরিস্থিতি এবং প্রাক্কলন নিয়ে কাজ করছে। এ দলের একাধিক সূত্র বলছে, দলটি টিএফআর বেড়ে যাওয়ার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে চাইছে। তাদের প্রাক্কলন বলছে, সর্বশেষ বর্ধিত টিএফআর ধরলে ২০৩১ সালে দেশের জনসংখ্যা হবে ১৯ কোটি ৩৮ লাখ। আর ২০৩৬ সালে সেটা ২০ কোটি ৬৩ লাখ। টিএফআর শূন্য দশমিক ১ বৃদ্ধি পাওয়ায় পাঁচ বছরে ৫৮ লাখ এবং ১০ বছরে ৯৬ লাখ অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পড়বে বাংলাদেশ।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মুন্সিগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মোহাম্মদ ফকরুল আলমঅর্ধেকের বেশি পদ শূন্য রেখে আপনি মানুষকে কীভাবে সেবা দিতে পারেন?কেন এমন হলো
গত ৯ মার্চ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ ও তাঁর তিনজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মী দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। আশরাফী আহমেদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে মাঠপর্যায়ে জনবলের স্বল্পতা, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীসহ ওষুধপত্রের স্বল্পতা আছে।’
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ আছে ৫৪ হাজার ২২৫টি। এর মধ্যে শূন্য পদের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৫০। অর্থাৎ ২৭ শতাংশ পদে কোনো জনবল নেই।
কোনো কোনো এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। ১০ মার্চ অধিদপ্তরের মুন্সিগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মোহাম্মদ ফকরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য রেখে আপনি মানুষকে কীভাবে সেবা দিতে পারেন?’
উপপরিচালকের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, মুন্সিগঞ্জ জেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অনুমোদিত পদ ৭৮১টি। এর মধ্যে ৪১৩টি পদেই কেউ নিযুক্ত নেই। অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ পদ শূন্য রেখে জেলার পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চলছে।
রোকেয়া বেগম বলেন, ইউনিয়নে পরিবার আছে ৪ হাজার ১০০-এর বেশি। আজ এক পরিবারে গেলে সেই পরিবারে আবার যেতে ৯ মাসের আগে সম্ভব হয় না।
রোকেয়া বেগম জেলার শ্রীনগর ইউনিয়নে পরিবারকল্যাণ সহকারী (ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট-এফডব্লিউএ) হিসেবে কাজ করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই ইউনিয়নে এফডব্লিউএর পদ আছে পাঁচটি। কাজ করছেন তিনি একা। বাকি চারজনের কাজও তাঁকে করতে হয়।
রোকেয়া বেগমের মতো পরিবারকল্যাণ সহকারীরা বাড়ি পরিদর্শন, উঠান বৈঠকের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা দেন। বাড়ি পরিদর্শনের সময় তাঁরা দম্পতি নিবন্ধন (সেবার আওতায় আনার জন্য) ও জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন করেন। তাঁরা নতুন দম্পতিকে পরামর্শসেবা বা কাউন্সেলিং দেন। এর মধ্যে আছে পরিকল্পিত পরিবার গঠন, জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি, গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, কৈশোরকালীন গর্ভধারণ রোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধবিষয়ক পরামর্শ। এ ছাড়া তাঁরা পরিবার পরিকল্পনার অস্থায়ী পদ্ধতি বিতরণ (বড়ি ও কনডম) করেন।
সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে নারী নিজের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ হারান।
রোকেয়া বেগম বলেন, ইউনিয়নে পরিবার আছে ৪ হাজার ১০০-এর বেশি। আজ এক পরিবারে গেলে সেই পরিবারে আবার যেতে ৯ মাসের আগে সম্ভব হয় না।
এফডব্লিউএ ছাড়া মাঠপর্যায়ে আরও কাজ করেন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (সাকমো)। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট কাজ আছে। বহু পদ শূন্য থাকায় তাঁদের সেসব কাজে ঘাটতি থাকছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী নেই
মাঠকর্মীরা বাড়ি পরিদর্শনের সময় দম্পতিদের বড়ি বা কনডম দিয়ে আসেন। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী (ইনজেকটেবল, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্ট) এবং স্থায়ী পদ্ধতি (ভেসেকটমি, লাইগেশন) গ্রহণ করানোর জন্য দম্পতিদের ইউনিয়ন সাবসেন্টার বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। প্রায় সব পদ্ধতিই বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ ও পরিচালক (লজিস্টিক) মো. আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেছেন, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ ঠিকমতো হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী কিনতে গড়িমসি করা হয়েছে। এখন সারা দেশে সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর কেন্দ্রীয় পণ্যাগার থেকে দেশের ২৩টি আঞ্চলিক পণ্যাগারে সামগ্রী পাঠানো হয়। সেখান থেকে সেগুলো উপজেলা পণ্যাগারে যায়। তারপর সেগুলো মাঠকর্মীদের দেওয়া হয়। কোথায় কোন পণ্য কী পরিমাণ মজুত আছে, তা ওয়েবসাইটে (scmpbd.org ) দেখা যায়।
গত ২৪ মার্চ ওই ওয়েবসাইট দেখিয়েছিল, কোনো আঞ্চলিক পণ্যাগারে কোনো ধরনের মুখে খাওয়ার বড়ি, আইইউডি (জরায়ুতে ব্যবহৃত দীর্ঘমেয়াদি গর্ভনিরোধ পদ্ধতি) এবং ইমপ্ল্যান্টের (নারীর বাহুতে চামড়ার নিচে ব্যবহৃত দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি) মজুত নেই। ১৮ হাজার কনডম ছিল শুধু রাঙামাটি আঞ্চলিক পণ্যাগারে। ইনজেকটেবলস ছিল শুধু বান্দরবান (১২,৩০০টি) এবং রাঙামাটি (২,৭০০টি) পণ্যাগারে।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর এই সংকট নিয়ে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এ সংকট দূর হয়নি। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ছয় মাসের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে এই সময় বেসরকারি উৎস থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী বিক্রি বেড়েছে। সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি) জানিয়েছে, তারা মানুষের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে। এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিম উদ্দীন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকেই আমাদের ওরাল পিল, কনডম, ইনজেকটেবল, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল; নিয়মিত আমাদের পণ্য ব্যবহার করেন। প্রায় এক বছর ধরে পিল, কনডম ও ইনজেকটেবলের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
সরকারি কর্মসূচি থেকে ওরাল পিল, ইনজেকটেবল, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্ট বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহারকারী এবং স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণকারীদের সরকার প্রণোদনা হিসাবে টাকা দেয়। একমাত্র কনডম বিক্রি হয়, এক ডজন ২ টাকা দামে।
এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিম উদ্দীন খান অনেকেই আমাদের ওরাল পিল, কনডম, ইনজেকটেবল, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল; নিয়মিত আমাদের পণ্য ব্যবহার করেন। প্রায় এক বছর ধরে পিল, কনডম ও ইনজেকটেবলের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।অন্যদিকে এসএমসিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী মুদিদোকান বা ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া যায়। রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার একটি বড় ফার্মেসির মালিক প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় এক বছর ধরে কনডম ও বড়ি বিক্রি বেড়েছে। ওই দোকানে ২৫ থেকে ১২০ টাকা দামে কনডম (তিনটির প্যাকেট) বিক্রি হয়। ৪৫০ টাকা দামের প্যাকেটও আছে। অনেক দরিদ্র দম্পতির পক্ষে নিয়মিত এসব কেনা সম্ভব হয় না।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর অপূর্ণ চাহিদার হার ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ শতাংশ দম্পতি প্রয়োজনের সময় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী পান না।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহারকারী সক্ষম দম্পতিদের হারও (সিপিআর) কমতির দিকে। এমআইসিএসের হিসাবে, ২০১৯ সালে সিপিআর ছিল ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে সিপিআর কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।
সরাসরি সরকারি অবহেলা
জনসংখ্যাবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ অভিযোগ করেছে, বেশ কয়েক বছর ধরে জনসংখ্যার বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাঁরা উদাহরণ হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কিছু ঘটনার কথা বলছেন।
২০১০ সালের ২ জুন জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আমি শক্তি মনে করি, বোঝা নয়। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কত দূর পর্যন্ত যাব, তা আমাদের ভাবতে হবে।’ বিশ্বের অনেক দেশে অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বিশেষ করে যুব জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে কোনো সমস্যা মনে করি না।’
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, এই বক্তব্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এনজেন্ডার হেলথের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর আবু জামিল ফয়সাল দুই দশকের বেশি সময় ধরে জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখেছি, কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটিবারের জন্যও ১১ জুলাইয়ের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখিনি।’
আবু জামিল ফয়সাল আরও বলেন, জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ হচ্ছে জনসংখ্যাবিষয়ক সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি। প্রতিবছর এই পরিষদের কমপক্ষে একবার সভা হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী সেই পরিষদের সভাপতি। বিগত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ওই পরিষদের সভা হয়েছে মাত্র একবার। এসব ঘটনা অন্য রকম বার্তা দেয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানটি প্রবর্তন করা হয়েছিল গত শতকের আশির দশকে। ২০০৪ সালের জনসংখ্যা দিবসে স্লোগান আসে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’। ২০১২ সালের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিতেও এই স্লোগানের উল্লেখ আছে। এই স্লোগানে একটি সন্তানের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেখান থেকে সরে এসে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর আবার ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানে ফেরত যায়।
পরিবারপ্রতি কয়টি সন্তান থাকা প্রয়োজন, তা নিয়েও সরকারের অবস্থান পাল্টেছে। জনসংখ্যাবিষয়ক স্লোগানের বদলগুলো সে কথাই বলছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানটি প্রবর্তন করা হয়েছিল গত শতকের আশির দশকে। ২০০৪ সালের জনসংখ্যা দিবসে স্লোগান আসে ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’। ২০১২ সালের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিতেও এই স্লোগানের উল্লেখ আছে। এই স্লোগানে একটি সন্তানের ওপর জোর দেওয়া হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেখান থেকে সরে এসে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর আবার ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগানে ফেরত যায়।
আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, এসব ঘটনা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, সরকার শূন্য পদ পূরণে মনোযোগ দেয়নি, মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহের বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। টিএফআর বৃদ্ধি এসবের মিলিত ফল।
‘গোদের ওপর বিষফোড়া’
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় বিগত অন্তর্বর্তী সকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগ ক্ষতিই করেছে। যেমন তারা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা দুটি বিভাগ বিলুপ্ত করে সবকিছু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় নিতে চেষ্টা করে।
বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের অধীনে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আছে, তা শোনা-বোঝার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাঁদের অবহেলা করে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকটা একতরফা উদ্যোগে অনেকে হতাশ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিএনপি সরকার একই অবস্থানে আছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের কাজের সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে সভা হয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যের সঙ্গে একীভূত করার অবস্থান থেকে নতুন সরকারকে সরে আসতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্বাধীন না থাকলে জনসংখ্যাবিষয়ক কাজগুলো চোখের আড়ালে চলে যাবে, গুরুত্ব হারাবে। এতে দেশেরই ক্ষতি হবে।’
কোন পথে যে চলি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রজনন হার, জনঘনত্ব ও নগরায়ণ বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান আছে। তবে জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানে কোনো দিকনির্দেশ বা পরামর্শ নেই। প্রতিবেদনে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ৩২টি সুপারিশ করা হয়েছে, তার কোনোটিতে জনসংখ্যা বিষয়ে কিছু নেই।
জন্মনিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সরাসরি কাজ করা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাকিয়ে আছেন নতুন সরকারের দিকে। তাঁরা আশা করছেন, বিএনপি সরকার জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দিয়ে এই খাতের সমস্যাগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। সরকার এই অধিদপ্তরকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসবে।
বিসিএস (পরিবার পরিকল্পনা) অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাশেম স্বাস্থ্যের সঙ্গে একীভূত করার অবস্থান থেকে নতুন সরকারকে সরে আসতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্বাধীন না থাকলে জনসংখ্যাবিষয়ক কাজগুলো চোখের আড়ালে চলে যাবে, গুরুত্ব হারাবে। এতে দেশেরই ক্ষতি হবে।তবে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে জনসংখ্যার ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, এ বিষয়ে দলটির অবস্থানের কথাও বলা নেই। ইশতেহারের বিভিন্ন অংশে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কথাবার্তা আছে। যেমন নারীর প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার শক্তিশালী করা, জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা নেওয়া (যখন উপার্জনক্ষম মানুষের সংখ্যা অন্যের উপার্জনে নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে বেশি হয়) বা নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া উদ্দীন হায়দার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জনসংখ্যা ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। বিএনপি যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজের কথা বলেছে, তার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সেবা অন্তর্ভুক্ত। আমরা এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় আছি। এঁদের অন্যতম কাজ হবে বাড়ি বাড়ি পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামজন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। টিএফআর কমানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আমাদের যত কম সময়ে সম্ভব টিএফআর ২ দশমিক ১-এ নামাতে হবে। প্রতিস্থাপনযোগ্য টিএফআর অর্জন জরুরি।পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্র (২০২৫-২০৩০) প্রণয়ন করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এখানে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে: সেবা ও সামগ্রী সহজলভ্য করা, সেবার মান বৃদ্ধি, বৈষম্য দূর করা, শহরে পরিবার পরিকল্পনা সেবা জোরদার করা, দম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সেবার চাহিদা তৈরি করা এবং গবেষণা, নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন জোরদার করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামের মতে, কৌশলপত্রের পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। টিএফআর কমানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আমাদের যত কম সময়ে সম্ভব টিএফআর ২ দশমিক ১-এ নামাতে হবে। প্রতিস্থাপনযোগ্য টিএফআর অর্জন জরুরি।’







