ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতটা রোমাঞ্চের, বন্ধুত্বের গল্পও ততটাই সুন্দর। গ্যালারিতে উত্তেজনা, মাঠে কঠিন লড়াই সবকিছুর মাঝেও কিছু সম্পর্ক থেকে যায় একেবারে আলাদা। জুড বেলিংহাম ও আর্লিং হলান্ড সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। দেশের জার্সি গায়ে তারা আজ প্রতিপক্ষ, কিন্তু মাঠের বাইরে তারা এখনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
১১ জুলাই মিয়ামিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা জুড বেলিংহ্যাম, আর নরওয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা আর্লিং হলান্ড। ম্যাচের ৯০ মিনিটে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড় দেবেন না। তবে শেষ বাঁশি বাজতেই হয়তো দেখা যাবে পরিচিত এক দৃশ্য দুই বন্ধু হাসিমুখে আলিঙ্গন করছেন। ফুটবলের সৌন্দর্য ঠিক এখানেই।
বন্ধুত্বের শুরু ডর্টমুন্ডে

এই বন্ধুত্বের গল্প শুরু জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। ২০২০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্মিংহাম সিটি ছেড়ে ডর্টমুন্ডে যোগ দেন জুড বেলিংহাম। তখন আর্লিং হলান্ড ইতোমধ্যেই ইউরোপের অন্যতম আলোচিত স্ট্রাইকার।
বয়সের পার্থক্য কিংবা অভিজ্ঞতার ব্যবধান তাদের দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গড়ে ওঠে দারুণ বোঝাপড়া। মাঠে জুডের নিখুঁত পাস আর অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হালান্ডের গোল করার কাজ আরও সহজ করে দিত। আর অনুশীলনের বাইরে দুজনের হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি আর একে অপরকে মজা করে খোঁচা দেওয়ার মুহূর্তগুলো ডর্টমুন্ডের ড্রেসিংরুমে ছিল নিয়মিত ঘটনা।
সতীর্থরা যেমন তাদের বন্ধুত্বের প্রশংসা করতেন, তেমনি সমর্থকেরাও বুঝে গিয়েছিলেন। এটি শুধু দুই সতীর্থের সম্পর্ক নয়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব।
ক্লাব বদলেছে, বন্ধুত্ব নয়

২০২২ সালে হলান্ড যোগ দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। এক বছর পর জুড বেলিংহাম পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে। দুই বন্ধু চলে যান ইউরোপের দুই ভিন্ন শক্তিশালী ক্লাবে।
অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো সময়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে ঠিক উল্টো। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নামার পরও ম্যাচের আগে কিংবা পরে তাদের হাসিমুখে গল্প করা, আলিঙ্গন আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য বারবার ধরা পড়েছে ক্যামেরায়।
হলান্ডও একাধিকবার বলেছেন, জুড শুধু অসাধারণ একজন ফুটবলার নন, দারুণ একজন মানুষও। ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোকে তিনি এখনও ভীষণ মিস করেন।
সমর্থকদের কাছেও বিশেষ এক জুটি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুই তারকার বন্ধুত্ব নিয়ে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে রয়েছে। ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা হলান্ডকে অনেক সমর্থক মজা করে জুডের "ব্যক্তিগত দেহরক্ষী" কিংবা "দুই মিটার লম্বা ভাইকিং ভাই" বলেও ডাকেন।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতার নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি অসাধারণ মাধ্যম।
৯০ মিনিটের জন্য শুধুই প্রতিপক্ষ

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে অবশ্য বন্ধুত্বকে কিছুক্ষণের জন্য পাশে সরিয়ে রাখতে হবে। জুড চাইবেন ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে। অন্যদিকে হলান্ডর লক্ষ্য থাকবে নরওয়াকে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
মাঠে প্রতিটি বলের জন্য লড়াই হবে, প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা থাকবে। সেখানে বন্ধুত্বের কোনো জায়গা নেই। কিন্তু খেলা শেষ হলেই সেই সম্পর্ক আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে।
ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্প

ফুটবলের আসল সৌন্দর্য শুধু গোল, ট্রফি কিংবা শিরোপায় নয়। কখনো কখনো একটি আলিঙ্গন, একটি হাসি কিংবা প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় মুহূর্ত।
জুড বেলিংহাম ও আর্লিং হলান্ডর বন্ধুত্ব সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। তারা দেখিয়েছেন, জয়ের জন্য লড়াই করা যায়, তবু বন্ধুত্ব অটুট রাখা যায়। আর এ কারণেই ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসার এক অসাধারণ গল্প।
ছবি: এএফপি. রয়টার্স ও ইন্সটাগ্রাম








