বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন আপাতত বন্ধ। আগামী ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন দুই মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।
আজ (৬ আগস্ট) বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি বিভাগীয় বেঞ্চ এই আদেশ দেন। বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি ফাতেমা আনওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এফবিসিসিআই সালিশ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।
যা ঘটেছে
গুলশান থানাধীন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ (নায়ক উজ্জ্বল) আজ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিট পিটিশন নম্বর ১০৮৫৬/২০২৬। সংবিধানের ১০২(২) অনুচ্ছেদে দায়ের করা এই রিটে বলা হয়, এফবিসিসিআই সালিশ ট্রাইব্যুনালে (মামলা নং ০৮/২০২৬) একটি মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বাচন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এই নিষ্ক্রিয়তাকেই রিটে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
রিটের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. বদরুদ্দোজা এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. মনিরুজ্জামান আসাদ। সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. খাইরুল আলাম।
আদালত যা বললেন
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বেঞ্চ রুল নিশি জারি করেন। একইসঙ্গে আদেশ দেওয়া হয়, এফবিসিসিআই সালিশ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আগামী ৮ তারিখের নির্বাচনসহ নির্বাচন-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম আগামী দুই মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। রুলে বিবাদী পক্ষকে জবাব দিতে বলা হয়েছে— কেন তাদের নিষ্ক্রিয়তাকে আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না।
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির নির্বাচন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধ চলছে। এফবিসিসিআই সালিশ ট্রাইব্যুনালে মামলা থাকা অবস্থায় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে ক্ষোভ ছিল একটি পক্ষের। আদালতের আজকের আদেশে সেই বিরোধই নতুন মাত্রা পেল।
এ বিষয়ে সমিতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য জানানো হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের পূর্ণাঙ্গ আদেশ পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রযোজক জাগো নিউজকে বলেন, ‘খোরশেদ আলম খসরু ও শামসুল আলম ইতিমধ্যে দুবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী তারা আর নির্বাচন করতে পারবেন না। নির্বাচন করতে হলে অন্তত একটি মেয়াদ নির্বাচনের বাইরে থেকে পরে আবারও তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সদস্য তানবীর হাসান জানান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির নির্বাচন ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। অভিনেতা উজ্জ্বলের রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে সেটি দুই মাসের জন্য স্থগিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্যানেল প্রেসিডেন্ট খোরশেদ আলম খসরু ভাই ও শামসুল আলম ভাইয়ের প্যানেলের সবাই চেয়েছিলাম নির্বাচনটা হোক। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খসরু ভাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, যাতে আমাদের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়, কিন্তু আজ চিত্রনায়ক উজ্জ্বল সাহেবের রিট পিটিশনের কারণে হাইকোর্ট নির্বাচনটি স্থগিতের নির্দেশ দেন।’
চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশকদের শীর্ষ এই সংগঠনটি দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভোটার তালিকা, গঠনতন্ত্র এবং আইনি জটিলতার কারণে প্রতিবারই প্রক্রিয়াটি থমকে গেছে। ফলে কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও দীর্ঘদিন ঝুলে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই। এরপর নতুন নির্বাচন আয়োজনের একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সমিতির নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয় ভোটার তালিকা এবং ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে। আগে একজন প্রযোজক একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে ‘আমমোক্তারনামা’র মাধ্যমে অতিরিক্ত ভোটাধিকার পেতেন। সমিতির একাংশ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিল। ২০২২ সালের ২১ মে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ভোটগ্রহণের দিন হাইকোর্টের নির্দেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। একই টিআইএন-এর আওতায় একাধিক ব্যক্তি ভোটার হওয়ার অভিযোগে আদালত নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এরপরও বিরোধের অবসান হয়নি।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নির্বাচন কমিশন নতুন তফসিল ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ভোট ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রযোজক যতগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন না কেন, তিনি একজন ভোটার হিসেবেই গণ্য হবেন। পাশাপাশি সদস্যপদ নবায়ন এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়। প্রথমে ১১ জুলাই ভোটগ্রহণের দিন ধার্য হলেও পরে তা পিছিয়ে ৮ আগস্ট করা হয়।
এমআই/আরএমডি








