বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে রেকর্ড পরিমাণ আয় করছে, অন্যদিকে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে। এই বৈপরীত্যের কেন্দ্রে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, এআই শুধু কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে জনবল ও বিনিয়োগের কাঠামোও নতুন করে সাজাতে বাধ্য করছে।
আউটপ্লেসমেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রযুক্তি খাতে গত কয়েক বছরের মধ্যে এক মাসে সবচেয়ে বড় ছাঁটাই হয়েছে, যার প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এআই। বিভিন্ন ট্র্যাকারের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রযুক্তি খাতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। সবশেষ ৬ জুলাই মাইক্রোসফট বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এসব পদ সরাসরি এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না; তবে এআই মানুষের দৈনন্দিন কাজকে স্বয়ংক্রিয় করে দিচ্ছে এবং দক্ষতার চাহিদা বদলে দিচ্ছে। ওরাকল গত ১২ মাসে ২১ হাজার কর্মী কমিয়েছে। কোম্পানিটি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলেছে, কার্যক্রমে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কর্মীবাহিনী কমেছে এবং ভবিষ্যতেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। একই কারণে গিটল্যাব, ইনটুইট, সেলসফোর্স, স্ন্যাপ, অ্যাটলাসিয়ান ও ব্লকও বড় আকারের ছাঁটাই করেছে। রেকর্ড আয় করেও কর্মী কমানোর উদাহরণও কম নয়। ক্লাউডফ্লেয়ার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক আয় করার পরও ২০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। সিসকো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লাভ ও রাজস্ব অর্জনের পর ৪ হাজার কর্মী কমিয়ে জানায়, এটি খরচ কমানোর জন্য নয়; বরং সিলিকন, অপটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও এআই খাতে নতুন করে জনবল বিন্যাসের অংশ। মেটা ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করলেও একইসঙ্গে প্রায় ৭ হাজার কর্মীকে এআইভিত্তিক নতুন পদে স্থানান্তর করেছে। গুগলও ক্লাউড, সাইবার নিরাপত্তা ও থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগে নীরবে কর্মী কমিয়ে ব্যবস্থাপনার স্তর ছোট করছে। অন্যদিকে আইবিএম ইতোমধ্যে মানবসম্পদ বিভাগের শতাধিক কাজ এআই এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা শুরু করেছে। শুধু সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান নয়, ডেল, জেনারেল মোটরস, পেপ্যাল, কয়েনবেস ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানও এআই অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয়তা এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ছাঁটাই শুধু ব্যয় সংকোচনের কৌশল নয়; বরং প্রযুক্তি খাতে এক নতুন রূপান্তরের ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে এআই মানুষের সব চাকরি কেড়ে নেবে-এমনটি না হলেও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দ্রুত কমবে এবং দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও এআই ব্যবহারে সক্ষম কর্মীদের চাহিদা বাড়বে। ফলে প্রযুক্তি খাতের চাকরির বাজারে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।








