বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জলবায়ু সংকট যেন দানা বেঁধে উঠছে। ইউরোপে চলমান ভয়াবহ দাবদাহে স্পেনে প্রাণহানি ছাড়িয়েছে তিন শতাধিক। তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস- কোনো দেশই রেহাই পায়নি। স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও প্রাণহানির কারণে কর্তৃপক্ষ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বহু গণআয়োজন।শুক্রবার ইউরোপ মহাদেশের অন্তত ১৫ কোটি মানুষকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্পেনের মোমো মনিটরিং সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী, এ দাবদাহে দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।বার্সেলোনার একটি বনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতর আটকে থাকতে হয়েছে। ফ্রান্সেও চরম তাপমাত্রায় মৃত্যু বাড়ছে। প্যারিসের সব হাসপাতালে জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।তপ্ত গাড়ির ভেতর আটকে বেশ কয়েকজন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া দাবদাহে অনিরাপদ এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে ডুবে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।ফ্রান্সের সীমান্ত ঘেঁষা জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারব্রুকেনে রেকর্ড ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। বেলজিয়ামের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ লিমবার্গে সর্বোচ্চ ৩৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশেও রেকর্ড ৩৭.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই তাপমাত্রা বাড়ছে। তবে ইউরোপের গতি সবচেয়ে বেশি, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।ফ্রান্সে টানা তিন দিন নজিরবিহীন গরম অনুভূত হওয়ার পর বর্তমানে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও উদ্বেগ কমছে না। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, হাসপাতালে রোগীর ভিড়ের চেয়ে বাড়িতে মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্যারিসের হাসপাতাল ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের চাপে সপ্তাহ শেষে অনুষ্ঠেয় প্যারিস প্রাইড মার্চ, মিউজিক ফেস্টিভালসহ বেশ কিছু বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। একই কারণে জার্মানিতেও ম্যারাথনসহ বহু আয়োজন বাতিল হয়েছে।তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও। সুইজারল্যান্ডের বেজনউ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টরই শুক্রবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ, নদীর পানি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা রিয়্যাক্টর ঠান্ডা করার জন্য উপযোগী নয়।তীব্র দাবদাহে কোলন থেকে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন ব্রাসেলসের আগে প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া তিন যাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ গবেষণা দল সতর্ক করেছে, তীব্র গরমের কারণে সোমবার থেকেই হিমবাহগুলো গলতে শুরু করবে, যা সাধারণত আগস্টে ঘটে থাকে। ২০২২ সালের পর এবারই হিমবাহ গলে যাওয়ার গতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।চেক আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন, ২০১২ সালের ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রার রেকর্ড শনিবার ভেঙে যেতে পারে। অস্ট্রিয়ায় রোববার তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে। বলকান অঞ্চলের দেশগুলোতেও চরম গরম দেখা যাচ্ছে, সার্বিয়ায় সপ্তাহান্তে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পারদ চড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস সতর্ক করে বলেছেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই চরম পরিস্থিতির সঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এখন মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।'ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, একটি স্থায়ী উচ্চ-চাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমী গড়ের চেয়ে ৫ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি চড়ছে।আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ইউরোপের এই মারাত্মক দাবদাহ ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি