আজ ২২ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সবচেয়ে আতঙ্কের দিনগুলোর একটি। সারা দেশে কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান এবং গণগ্রেফতারের মধ্যেই রাজশাহীতেও তৈরি হয়েছিল এক ভীতিকর পরিস্থিতি। বিশেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নগরীর বিভিন্ন ছাত্রমেসে পরিচালিত অভিযান শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেক শিক্ষার্থী সেদিন রাতেই মেস ছেড়ে আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষকদের বাসা কিংবা পরিচিতদের আশ্রয় নেন। কেউ কেউ নিরাপত্তার জন্য বাসার ছাদেও রাত কাটান।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২২ জুলাই থেকে দেশব্যাপী ‘চিরুনি অভিযান’ শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওইদিন সারাদেশে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। রাজধানী ঢাকায় মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৫১৬ জনকে আটক করা হয়। ১৭ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে সারা দেশে গ্রেফতারের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়।
একই দিন সংঘর্ষ ও নাশকতার ঘটনায় সারাদেশে ১৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ এলাকায় ৭১টি, চট্টগ্রাম মহানগরে ১৪টি এবং দেশের অন্যান্য জেলায় ৭৯টি মামলা হয়। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। র্যাবও পৃথক অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেফতার করে।
‘১৬ জুলাইয়ের ঘটনার পর আন্দোলন দমাতে ২১ ও ২২ জুলাই রাজশাহীজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়।’
তবে জাতীয় এসব ঘটনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যুষিত শহর রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নগরীর মেহেরচণ্ডী, বিনোদপুর, কাজলা, ভদ্রা, তালাইমারী, শালবাগান ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া মেসে বসবাস করতেন। আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানোর খবর ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা জানান, ২২ জুলাই রাতজুড়ে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর টহল এবং তল্লাশি চলতে থাকে। বিভিন্ন মেসে পরিচয় যাচাই, কক্ষ তল্লাশি এবং শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই আশঙ্কা করেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাদের আটক করা হতে পারে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাবির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা/ ছবি: জাগো নিউজ
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক শিক্ষার্থী রাতের মধ্যেই মেস ত্যাগ করেন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসায়, কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছে, আবার কেউ পরিচিতজনের বাসায় আশ্রয় নেন। অনেকেই নিরাপদ মনে করে বাসার ছাদ কিংবা অন্যত্র গোপনে অবস্থান করেন। পুরো নগরজুড়ে তখন এক ধরনের অনিশ্চয়তা, গুজব ও ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ২২ জুলাই রাত ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে ভীতিকর রাতগুলোর একটি। একদিকে বাইরে কারফিউ, অন্যদিকে মেসে মেসে অভিযান ও তল্লাশির খবর-সব মিলিয়ে কেউ স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
ফিরে দেখা ২১ জুলাই / ইন্টারনেট বন্ধে ভারতীয় নেটওয়ার্কে যোগাযোগ রাজশাহীর সমন্বয়কদের
জুলাই গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার কারণে গ্রেফতার হন বর্তমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম।
‘২২ জুলাইয়ের রাতটি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন মেসে অভিযান চালানোর খবর আসতে থাকে। একের পর এক ফোনকল আর মেসেঞ্জারের বার্তায় জানতে পারি, কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশি চালাচ্ছে। তখন আমরা কেউই নিজের মেসে নিরাপদ বোধ করিনি।’
আন্দোলনের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ২২ জুলাই আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি মনে পড়লেই আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত, সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং দুঃসহ অভিজ্ঞতাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, ১৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সহিংস ঘটনার একটি ঘটে। সেদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে পুরো ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আমরা আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থেকে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে ছিলাম। ওই দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করা হয়। একই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার পর আন্দোলন দমাতে ২১ ও ২২ জুলাই রাজশাহীজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়।
আরও পড়ুন
ফিরে দেখা ২০ জুলাই / কারফিউ-সেনা মোতায়েনেও থামেনি সাভারের আন্দোলন
রাবি শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, সেই অভিযানের অংশ হিসেবে ২১ জুলাই রাজশাহীর বাঘমারা এলাকা থেকে আমিসহ আমাদের ৪ জনকে একসঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় আন্দোলনের খবর নিয়মিত জানার চেষ্টা করতাম। প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ৬ আগস্ট আমি কারামুক্ত হই। দীর্ঘ সেই বন্দিজীবনের অবসান হলেও আন্দোলনের স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়।
‘২১ ও ২২ জুলাই রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন মেসে মেসে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী, আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অনেকেই দিনের পর দিন হয়রানি ও আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। সেই সময় রাজশাহীর প্রতিটি ছাত্রাবাস ও মেসে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। ২২ জুলাই আমার জীবনের এমন একটি দিন, যা কোনোদিন ভুলতে পারব না।’
তিনি বলেন, শুধু আমি নই, ২১ ও ২২ জুলাই রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন মেসে মেসে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী, আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অনেকেই দিনের পর দিন হয়রানি ও আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। সেই সময় রাজশাহীর প্রতিটি ছাত্রাবাস ও মেসে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। ২২ জুলাই আমার জীবনের এমন একটি দিন, যা কোনোদিন ভুলতে পারব না। এই দিনটি আমাকে আন্দোলনের মূল্য, ত্যাগ এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রক্ষার সংগ্রামের কথা সবসময় মনে করিয়ে দেয়। তাই ২২ জুলাই আমার জীবনে চিরস্মরণীয় ও অমলিন হয়ে থাকবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, ২২ জুলাই রাতে মেহেরচণ্ডী এলাকায় তল্লাশি বা ‘সার্চিং’ চালানোর খবর ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, তাদের অবস্থানেও অভিযান হতে পারে। ফলে সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করেন। সেই রাতে এক ভাইয়ের মেসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ দেখে সেই জায়গা আমরা পরিবর্তন করি। সেই সময়টাতে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষা। সবাই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রাত কাটিয়েছেন।

এদিকে জাতীয় পর্যায়েও দিনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২২ জুলাই রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোটা সংস্কারসংক্রান্ত সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন। এর আগে গণভবনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সহিংসতার জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী মো. আরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ২২ জুলাইয়ের রাতটি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন মেসে অভিযান চালানোর খবর আসতে থাকে। একের পর এক ফোনকল আর মেসেঞ্জারের বার্তায় জানতে পারি, কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশি চালাচ্ছে। তখন আমরা কেউই নিজের মেসে নিরাপদ বোধ করিনি।
তিনি বলেন, অনেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও মোবাইল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। কেউ আত্মীয়ের বাসায়, কেউ বন্ধুর বাসায়, আবার কেউ রাতভর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অবস্থান পরিবর্তন করেছি। পুরো রাতটাই কাটে গ্রেফতারের আতঙ্কে। তখন মনে হয়েছিল, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই যেকোনো সময় আমাদেরও আটক করা হতে পারে। ২২ জুলাইয়ের সেই ভয়, অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের রাত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারব না।
আরও পড়ুন
ফিরে দেখা ১৬ জুলাই: ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস পায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
এদিকে একই দিন সরকার নির্বাহী আদেশে ২৩ জুলাইও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে এবং দেশের ইন্টারনেট সংযোগ পঞ্চম দিনের মতো বন্ধ রাখে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবিতে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের মধ্যে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দেন।
এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। ২২ জুলাই ছিল সেই কারফিউর তৃতীয় দিন। সেদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। তবে রাজশাহীতে সেই স্বল্প সময়ের বাইরে পুরো দিন ও রাতজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে। শিক্ষার্থীদের কাছে ২২ জুলাই শুধু একটি তারিখ নয়, বরং আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, গুজব এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়ানোর এক দীর্ঘ রাতের স্মৃতি হয়ে আছে।
এনএইচআর/এএসএম








