কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লিওনেল মেসির অবদান একটি অ্যাসিস্ট। সেই অ্যাসিস্ট তাকে বসিয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতার আসনে। নামের পাশে এখন দশ অ্যাসিস্ট। জার্মান কিংবদন্তি ফ্রিটজ ভাল্টারের দীর্ঘদিনের রেকর্ডে ভাগ বসালেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

এই মেসিকে কীভাবে থামাবেন? তরুণ মেসিকে থামানোর জন্য পাসিং লাইন ব্লক, ডাবল মার্কিং, দুর্বল পায়ে বাধ্য করা কিংবা জোনভিত্তিক কভারেজ করেও আটকে রাখা যায়নি। ৩৯ বছর বয়সেও যাচ্ছে না। তাই শারীরিক আঘাত বা রক্তাক্ত করে দেওয়া ছাড়া বোধহয় আর কোনো উপায়ও নেই। সুইসদের বিপক্ষে কানসাসে দেখা গেলো রক্তাক্ত মেসিকেই।

রক্তাক্ত হয়েও সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেই মাঠ ছেড়েছে মেসি। প্রতিপক্ষের নিষ্ঠুরতায় রক্তাক্ত মেসি হয়তো মনে-মনে হেসেছেনই। আর্জেন্টাইন গ্রেট তো জানেন- তাকে রক্তাক্ত করে সেমিফাইনালের পথটা আরও সুগম করে দিয়েছে সুইসরা। এবার কপাল পুড়তে পারে সেমিতে ইংল্যান্ডেরও। অতীত ইতিহাস তো তাই বলে। মেসির রক্ত বা চোখের জল কখনো বেঈমানি করেনি বরং দিয়েছে বড় সাফল্য। হোক সেটা ক্লাব বা আন্তর্জাতিক।

২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকায় তো সেই প্রমাণ মেসি রেখেছেন। ক্লাবের জার্সিতেও এল ক্লাসিকোতে ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদকে শেষ মিনিটে কাঁদিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি।

রক্তাক্ত মেসি বরং বেশি শক্তিশালী

রক্তাক্ত পায়ের গোড়ালি (সেমিফাইনাল, ২০২১ কোপা আমেরিকা)

জাতীয় দলের হয়ে মেসির কোনো শিরোপা নেই। তিনি কেবলই ক্লাবের কিংবদন্তি। আর্জেন্টিনাকে কখনোই কিছু জেতাতে পারেননি। একবার বিশ্বকাপ ও দুইবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল খেলেও ছিলেন শিরোপাশূন্য। অবশেষে নিজের নামের সেই অপবাদ ঘোচানোর আসরটাই ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা।

সেই আসরের সেমিফাইনালে কলম্বিয়া তাকে একের পর এক ট্যাকেল করে রক্তাক্ত করে ছাড়ে। পায়ের গোড়ালি দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায় মেসির। বরাবরই মারাত্মক ট্যাকেলের জন্য কলম্বিয়ানদের দুর্নাম রয়েছে। কলম্বিয়ার বিপক্ষেই নেইমার ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে অল্পের জন্য বেঁচে যান চিরতরে পঙ্গু হওয়া থেকে।

একুশের সেমিফাইনালে ১-১ গোলে ড্র ছিল আর্জেন্টিনা-কলম্বিয়া ম্যাচ। টাইব্রেকারে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে ৩-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। মেসিকে রক্তাক্ত করেও আলবিসেলস্তেদের ফাইনালে যাওয়া রুখতে পারেনি কলম্বিয়া। সেই আসরের শিরোপাও গেছে আর্জেন্টিনার ঘরে।

রক্তাক্ত মেসি বরং বেশি শক্তিশালী

কাঁদতে কাঁদতে মাঠের বাইরে (ফাইনাল, ২০২৪ কোপা আমেরিকা)

কোপার পরের আসরেও ফাইনালে ওঠে এবং শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এবার ফাইনালে প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সব প্রতিপক্ষই মেসিকে নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে। কিন্তু কলম্বিয়া বরাবরই যেকোনো প্রতিপক্ষকে অতিয়ামাত্রায় ট্যাকেল করে থাকে।

২০২১ আসরের সেমিফাইনালের মতো চব্বিশের ফাইনালেও মেসিকে মারাত্মক সব ট্যাকেল করে কলম্বিয়ানরা। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় সান্তিয়াগো আরিয়াসের ট্যাকলে তিনি প্রথম আঘাত পান। পরবর্তীতে ৬৬ মিনিটে বল ছাড়া দৌড়াতে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অশ্রুসিক্ত হয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।

ডাগআউটে তার গোড়ালিতে বরফ (আইস প্যাক) দেওয়া হয় এবং সাইডলাইনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে আর্জেন্টিনা ১-০ ব্যবধানে শিরোপা জেতে। মেসিকে আহত করেও আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় ঠেকাতে পারেনি কলম্বিয়া।

রক্তাক্ত মেসি বরং বেশি শক্তিশালী

রক্তাক্ত মেসিময় এল ক্লাসিকো (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, ২০১৭)

বার্সেলোনার জার্সিতে অসংখ্য দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন লিওনেল মেসি। বরাবরই তিনি ছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে এক ত্রাসের নাম। মেসিকে কখনোই পুরোপুরি দমিয়ে রাখতে সফল হয়নি লস ব্লাঙ্কোসরা। সেটা শারীরিকভাবে আঘাত করে হলেও।

২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এল ক্লাসিকোর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের শুরুতেই মার্সেলোর এক চ্যালেঞ্জে তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায়। সংক্ষিপ্ত চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবার মাঠে ফিরে খেলতে থাকেন।

চোট নিয়েও পুরো ম্যাচজুড়ে বার্সেলোনার আক্রমণে নেতৃত্ব দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোল করে বার্সেলোনাকে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন। গোলের পর বার্নাব্যুর দর্শকদের সামনে নিজের বার্সেলোনার জার্সি উঁচিয়ে ধরা মেসির সেই উদ্‌যাপন এল ক্লাসিকোর ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে।

এই তিনটি ঘটনার সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালও যুক্ত হলো। রক্তাক্ত হওয়ার আগে দলের প্রথম গোলে অ্যাসিস্ট করেন তিনি। তার কর্নার থেকেই হেডে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টার। অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোলের সেমিফাইনালের জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। মেসি রক্তাক্ত হয়েছেন বা কেঁদেছেন এমন আসরে আর্জেন্টিনা উঁচিয়ে ধরেছে শিরোপা। সবশেষ দুই কোপা আমেরিকার ফলাফল তো সেটাই বলে।

সুইসরা মেসিকে রক্তাক্ত করে কি তাহলে কপাল পুড়িয়ে দিলো ইংল্যান্ডের?

আইএন/এএসএম