দিল্লির জন্তর মন্তরে আবারো সরব তরুণদের কণ্ঠ। চলমান ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলন কীভাবে গণতান্ত্রিক পরিসরকে প্রশ্ন করে, আবার সেই পরিসরকেই আরো শক্তিশালী করে।
ককরোচ জনতা পার্টির চলমান এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ফের আলোচনায় এসেছে বলিউডের কয়েকটি আলোচিত সিনেমা। ‘রং দে বসন্তী’, ‘যুবা’, ‘নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা’, ‘সর্দার উধাম’ ও ‘ম্যায় আজাদ হুঁ’—এসব সিনেমায় প্রতিবাদকে কখনোই দেশবিরোধী হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
ভিন্ন সময়ে নির্মিত এই সিনেমাগুলো অস্থিরতা বা সহিংসতাকে মহিমান্বিত করেনি। বরং দেখিয়েছে, প্রতিবাদ নাগরিক সচেতনতারই একটি স্বাভাবিক প্রকাশ, যার মাধ্যমে মানুষ রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করে।
২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রং দে বসন্তী’ এখনো প্রতিবাদভিত্তিক বলিউড সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ। সিনেমাতে কয়েকজন নিরুদ্বেগ, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা তরুণ একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ, ভগত সিং, রাজগুরু, আশফাকউল্লাহ খান ও রামপ্রসাদ বিসমিলের জীবনের সঙ্গে পরিচিত হয়। মজা করে শুরু হওয়া সেই যাত্রাই ধীরে ধীরে তাদের বর্তমানকে দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। সিনেমাটি দেখায়, অতীতের সংগ্রাম কীভাবে নতুন প্রজন্মকে গণতন্ত্র রক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য ইন্ডিয়া গেটে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি। সেখানে দেখানো হয়, ব্যক্তিগত উপলব্ধি কীভাবে ধীরে ধীরে জনআন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। পরিচালক রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা দেখিয়েছেন, অতীতের আত্মত্যাগকে স্মরণ করাই বর্তমানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রথম ধাপ হতে পারে।
অন্যদিকে, মণি রত্নম পরিচালিত ‘যুবা’ তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আরো বাস্তব ও কঠিন প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন। অজয় দেবগনের চরিত্র ‘মাইকেল’ একজন অভিজ্ঞ আন্দোলনকর্মী, যিনি তরুণদের রাজনীতিতে এসে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তার সঙ্গে বিবেক ওবেরয়ের চরিত্র অর্জুনের কথোপকথনে ফুটে ওঠে—ব্যক্তিগত ক্ষোভকে সংগঠিত উদ্যোগে রূপ না দিলে কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সিনেমাটি দেখিয়েছে, প্রতিবাদ বিশৃঙ্খল মনে হলেও সেটি অর্থবহ হতে পারে। ক্যাম্পাস ও রাজপথকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চার জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বিতর্ক, মতভেদ ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র নতুন শক্তি পায়। তরুণদের নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেদেরই গড়ে তোলার আহ্বান হিসেবে মাইকেলের চরিত্রটি এখনো বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
‘যুবা’ যদি প্রতিবাদের উচ্চকণ্ঠ রূপ দেখিয়ে থাকে, তবে ‘নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা’ তুলে ধরেছে নীরব ঐক্যের শক্তি। জেসিকা লাল হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায়ের লড়াইয়ে একটি শান্তিপূর্ণ মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি কীভাবে সারা দেশের জনআন্দোলনে রূপ নেয়, সেটিই সিনেমাটির মূল শক্তি। এটি মনে করিয়ে দেয়, শান্তিপূর্ণভাবে একত্র হওয়াও গণতন্ত্রের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি।
সমষ্টিগত আন্দোলনের গভীরতা বোঝাতে ‘ম্যায় আজাদ হুঁ’ সিনেমার কথাও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠে গাওয়া ‘ইতনে বাজু ইতনে সর’ গানটি দেখায়, একা মানুষের হতাশা কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থানে পরিণত হয়ে প্রকৃত শক্তিতে রূপ নেয়।
অন্যদিকে, শুজিত সরকার পরিচালিত ‘সর্দার উধাম’ সিনেমায় ভিকি কৌশলের সংলাপগুলো অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্রকে আরো গভীরভাবে তুলে ধরে। সিনেমাটি স্পষ্টভাবে বলে, অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা মানে সেই অন্যায়ের সঙ্গী হয়ে যাওয়া। একইসঙ্গে অতীতের প্রতিরোধের ইতিহাস মনে রাখাও বর্তমানের ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য জরুরি।
উধাম সিংয়ের যাত্রা দেখায়, প্রকৃত দেশপ্রেম অনেক সময় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সাহসের মধ্যেই নিহিত থাকে, যদিও তার জন্য ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হয়। ভিকি কৌশলের সংযত অভিনয় এই বার্তাকে আরো মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
মূলত, এই সিনেমাগুলো প্রতিবাদকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে নয়, বরং মানুষের নিজের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে। এগুলো একটি মৌলিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে—কোনো সমাজ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেই সমাজের মানুষ অন্যায় দেখলে মুখ খুলতে সাহস করে।
জন্তর মন্তরে যখন প্রতিবাদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, তখন এই সিনেমাগুলোর বার্তাও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সিনেমা শুধু সেই প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গকে পর্দায় ধরে রেখেছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই আগুন জ্বালিয়ে রাখছে সাধারণ মানুষই। অর্থাৎ, সিনেমাগুলো দেখিয়েছে কী করা সম্ভব। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষজন।
*ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে








