খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন বলেছেন, পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া এ ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই অযথা আতঙ্কিত হওয়া বা বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করা- কোনোটিই ঠিক হবে না।

বুধবার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে পাইকগাছা পৌরসভার মডার্ন বেকারির কয়েকজন কর্মচারী বনভোজনের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্না করছিলেন। রান্নার একপর্যায়ে তারা লক্ষ্য করেন, মাংসের রং অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে গেছে। পরে তারা হাঁড়িসহ মাংসটি স্থানীয় থানায় নিয়ে যান।

ঘটনার পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও মাংসের রং পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নষ্ট মাংস, রাসায়নিক দূষণসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

শনিবার (২৫ জুলাই) এক সাক্ষাৎকারে বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মিনারা খাতুন বলেন, মাংস একদিনের পুরোনো ছিল, এ তথ্যই সবুজ হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ছবি দেখে আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। আবার এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলাও করা উচিত নয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রং, দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করতে হবে।

তিনি বলেন, জবাইয়ের পর ০ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে একদিনের মধ্যে মাংস সাধারণত সবুজ হয়ে যায় না। এসময় মাংস কিছুটা গাঢ় বা বাদামি বর্ণ ধারণ করতে পারে, তবে স্পষ্ট সবুজ রং ধারণ করা স্বাভাবিক নয়।

মাংসের ঝোল লাল থাকায় সেটি নিরাপদ ছিল এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন ড. মিনারা খাতুন। তিনি বলেন, মাংসের কিছু অংশে সবুজাভ পরিবর্তন হলেও ঝোলের রং স্বাভাবিক লাল বা লালচে থাকতে পারে। কারণ ঝোলের রং মূলত রক্তের রঞ্জক, মসলা এবং রান্নার সময় সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু ঝোলের রং দেখে মাংস নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।

একই গরুর অন্য অংশ কিনে নেওয়া ক্রেতাদের কোনো সমস্যা হয়নি কসাইয়ের এমন দাবি কিংবা বেকারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে এ ধরনের ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

রান্নার সময় গরুর মাংস হয়ে গেল সবুজ, খুলনায় চাঞ্চল্য

তার ভাষ্য, একই পশুর বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ পদ্ধতি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা দূষণের মাত্রার ভিন্নতার কারণে আলাদা অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। আবার প্রচলিত খাদ্য-সম্পর্কিত রাসায়নিকের কারণে রান্নার সময় মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ারও নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

ড. মিনারা খাতুন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে মাংসের লাল রঞ্জক মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার কারণে সালফমায়োগ্লোবিন সৃষ্টি, তামা বা অন্যান্য ধাতব যৌগের সংস্পর্শ, কিংবা সিউডোমোনাস প্রজাতির রঞ্জক উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পেশির আঁশে আলোর প্রতিফলনের কারণেও সবুজ, নীল বা রংধনুর মতো আভা দেখা যেতে পারে, যা সবসময় মাংস নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নয়।

তিনি বলেন, জবাই থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড চেইন বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানি এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মাংসের উৎস, জবাইয়ের সময় ও সংরক্ষণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এফএ/এএসএম