ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট রায় দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। একই দিন সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই কমিশনের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নুরুল আমিনের আইনজীবী শিশির মনির। তার প্রশ্ন, হাইকোর্টের রায় প্রকাশের আগে শপথ দেওয়া যায়?

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর না রাখার অবস্থান বহাল রাখে।

রায়ের পর সারোয়ার আলমগীরের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, এ রায়ের ফলে তার মক্কেলের নির্বাচনি গেজেট প্রকাশ ও শপথ গ্রহণে আর কোনো আইনি বাধা নেই।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নুরুল আমিনের পক্ষে আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী জানান, হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে।

আরও পড়ুন

বিএনপির সারোয়ার আলমগীরের এমপি হিসেবে শপথ নিতে বাধা নেই

তবে এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে এবং শপথের উদ্যোগ নেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন নুরুল আমিনের আইনজীবী শিশির মনির। ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, তখনো হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশিত হয়নি, বিচারকরা রায়ে সইও করেননি এবং আদালত থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনো আদেশ বা নথি পাঠানো হয়নি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করল? তার ভাষ্য, যদি কমিশন কেবল আইনজীবীর সনদ, সংবাদ প্রতিবেদন বা মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতে গেজেট প্রকাশ করে থাকে, তাহলে তা আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করার শামিল।

শিশির মনির আরও বলেন, প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে। সেই সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার আগেই গেজেট প্রকাশ এবং শপথের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আদালতের প্রক্রিয়ার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে না বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, রায়ের কপি নির্বাচন কমিশনের হাতে পৌঁছানোর আগে গেজেট প্রকাশ বা শপথের উদ্যোগ আইনসম্মত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি নির্বাচন কমিশনের আচরণকে রহস্যজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন পদক্ষেপ প্রত্যাশিত নয়। তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড জনমনে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

এ মামলার শুনানিতে জামায়াতের প্রার্থী মো. নুরুল আমিনের পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির ও আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী এবং সারোয়ার আলমগীরের পক্ষে আইনজীবী আহসানুল করিম ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত ছিলেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তা সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করার পর ঋণ খেলাপের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মো. নুরুল আমিন। শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করে।

আরও পড়ুন

বিএনপির সারোয়ার আলমগীরের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন জামায়াত প্রার্থী

ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন সারোয়ার আলমগীর। ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের আদেশ স্থগিত করে তাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়ে রুল জারি করে।

পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন মো. নুরুল আমিন। ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করে। তবে সারোয়ার আলমগীরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সারোয়ার আলমগীর বিজয়ী হন। কিন্তু আপিল বিভাগের নির্দেশনার কারণে তার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

পরবর্তীতে মো. নুরুল আমিনের করা আপিলের শুনানি শেষে ১৬ জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে যত দ্রুত সম্ভব, সম্ভাব্য দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়। সে অনুযায়ী সারোয়ার আলমগীরের নির্বাচনী ফলাফল এতদিন প্রকাশিত হয়নি।

বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ বলে রায় দেয়। ওই রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই নির্বাচন কমিশন তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে এবং শপথ গ্রহণের উদ্যোগ নেয়, যা নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এফএইচ/এমআইএইচএস/