রূপসা গ্যাসভিত্তিক ৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবারও শনির দশা। যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে আগামী বছরের মে মাসে চালুর অপেক্ষায় থাকা কেন্দ্রটি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড। সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি গত মাসে তাদের জানিয়ে দিয়েছে, দেশে গ্যাস নেই। তাই ওই কেন্দ্রে তারা গ্যাস দিতে পারবে না। এজন্য নর্থওয়েস্টের সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে করা চুক্তি বাতিলে চিঠি দিয়েছে সুন্দরবন। নিশ্চিত গ্যাসের সংস্থান ছাড়াই বিগত সরকারের আমলে নেওয়া বিশাল এই প্রকল্প এখন সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারকরাও।

সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম চন্দ্র কুন্ডু বুধবার যুগান্তরকে বলেন, নতুন এই কেন্দ্রে দেওয়ার মতো গ্যাস নেই। তাই চুক্তি বাতিলের জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারণ আগামী দিনে কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাসিবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, হঠাৎ এ ধরনের চিঠিতে গ্যাস দেওয়া যাবে না, বললেই হবে নাকি। সিনিয়র কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনা করে পরিচালনা পর্ষদে বিষয়টি তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির চেয়ারম্যান হচ্ছেন জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সুন্দরবন বিতরণ কোম্পানি তার বিভাগের আওতাধীন।

সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ করতে না পারলে রূপসাকে জরিমানা দিতে হবে। এটা চুক্তিতে আছে। এখন সুন্দরবনে ওই জরিমানা পরিশোধের মতো অর্থ নেই।

ভারত থেকে পাইপলাইনে গ্যাস এনে রূপসায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। কিন্তু ভারত থেকে গ্যাস আনার ব্যাপারে সেই সরকার কোনো চুক্তি করেনি। কারণ, ভারত নিজেই গ্যাস সংকটে আছে। এখন স্থানীয় গ্যাস দিয়ে বড় এই কেন্দ্র চালানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এই বছরের মধ্যে বেসরকারি কোম্পানি ইউনাটেড গ্রুপের চট্টগ্রামের ৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। ওই কেন্দ্র চালু করতে দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার হবে। সেই গ্যাস সরবরাহ নিয়েও চিন্তায় আছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার মধ্যে রূপসা কেন্দ্র সর্ববৃহৎ। ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে বেশির ভাগ অর্থ ঋণ দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিপি। এখন এটি চালু করতে তারাও চাপ দিচ্ছে সরকারকে। কারণ, রূপসা কেন্দ্র চালু না হলে তাদের অর্থের কিস্তি ফেরত পাওয়া কঠিন হবে।

জানা যায়, ২০১৭ সালে রূপসায় গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এরপর ওই এলাকার গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সুন্দরবন তাদের সঙ্গে গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করেছে। ২০১৮ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালে এটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চালু হয়নি।

নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, আগামী বছরের মে মাসে রূপসা কেন্দ্র চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখানে সরকার বিনিয়োগ করে ফেলেছে। এটি এখন সরকারি সম্পদ বা জনগণের সম্পদ। তাছাড়া অন্যান্য বেরসকারি কেন্দ্রের চেয়ে এর উৎপাদন খরচও অনেক কম হবে। গ্যাস পেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকায় উৎপাদন করা যাবে। যেখানে বেসরকারি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ইউনিট ৭ টাকার বেশি দামে কিনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি।

কিন্তু রূপসা কেন্দ্রে গ্যাস দেওয়ার ব্যাপারে আপাতত সরকারের সামনে ভোলা ক্ষেত্র থেকে গ্যাস এনে খুলনায় দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে বরিশাল এবং এরপর খুলনা আনা বেশ কঠিন। তাছাড়া সেই পাইপলাইন বসাতে তিন বছর লাগবে।

সোমবার বিদ্যুৎ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ফ্যাসিস্ট সরকার পরিকল্পনা ছাড়াই বিদ্যুৎ খাতে প্রকল্প নিয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। তার অন্যতম প্রমাণ রূপসা ৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র।