‘রাত প্রায় ১২টার দিকে প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙে। কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি। ঘর, দরজা, ছাগলসহ সব নদীতে চলে গেছে। শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি।’

যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন রহিমা বেগম। তার মতো অনেকেরই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যমুনার অব্যাহত নদীভাঙনে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়। গত কয়েক দিনের ভয়াবহ ভাঙনে শতাধিক বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।

আরও পড়ুন

যমুনার গ্রাসে বিলীন অর্ধশতাধিক বসতভিটা

নদীভাঙনের মুখে পড়েছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদরাসা। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কয়েকশ শিক্ষার্থীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও যেকোনো সময় যমুনার গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও নদীর কিনারায় ঝুলে আছে বসতঘরের শেষ অংশ, কোথাও আবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো ভিটেমাটি বিলীন হয়ে গেছে। আতঙ্কে কেউ ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ নিজের চোখের সামনেই জীবনের সব সঞ্চয় নদীতে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন। চারদিকে শুধু দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর অনিশ্চয়তার ছাপ।

‘সব নদীতে চলে গেছে, শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি’

জীবনে তিনবার নদীভাঙনের নির্মম শিকার হয়েছেন ৭০ বছরের শান্তি বেগম। প্রায় দুই দশক আগে ব্রাহ্মন্দী গ্রামে শেষ সম্বল দিয়ে একটি ছোট্ট বসতভিটা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে সেখানেই কষ্টের সংসার চলছিল। কিন্তু কয়েকদিন আগে গভীর রাতে যমুনার তীব্র স্রোত মুহূর্তেই তার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেয়।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শান্তি বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‌‌‌‘জীবনে তিনবার নদী আমার ঘর কেড়ে নিয়েছে। ভাবছিলাম, এবার হয়তো রক্ষা পাবো। কিন্তু শেষ সম্বলটাও চলে গেল। এখন কোথায় থাকবো, কীভাবে বাঁচবো কিছুই জানি না। হাতে খাবার নেই, টাকা-পয়সাও নেই।’

আরও পড়ুন

আড়িয়াল খাঁ’র পাড়ে ভাঙন, হুমকির মুখে সেতু

একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানালেন ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত নুরুন্নাহার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার ঘরের সবকিছু নদীতে চলে গেছে। স্থানীয়দের সাহায্যে শুধু কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল বের করতে পেরেছি। হাঁস-মুরগিগুলোও নদীতে ভেসে গেছে। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

রহিমা বেগম নামের আরেকজন বলেন, ‘রাত প্রায় ১২টার দিকে প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙে। কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি। ঘর, দরজা, ছাগলসহ সব নদীতে চলে গেছে। শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি।’

‘সব নদীতে চলে গেছে, শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি’

ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘চোখের সামনে সব নদীতে ভেসে গেল। এখন কোথায় যাবো, কী করবো আল্লাহই জানেন।’

এদিকে নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে রয়েছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদরাসা। নদী থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চারতলা একাডেমিক ভবনের সীমানাপ্রাচীর ও টয়লেট এরইমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ভবনও যেকোনো সময় নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

গাইবান্ধায় নদ-নদীর পানি কমছে, শুরু হয়েছে ভাঙন

চরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীর জন্য এই মাদরাসাই একমাত্র উচ্চশিক্ষার সুযোগ। আশপাশে কোনো উচ্চবিদ্যালয় না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি হারিয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দা চান মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আর কোনো হাইস্কুল নেই। এই মাদরাসাটি নদীতে চলে গেলে শত শত ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা চাই সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিক।’

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘এই মাদরাসাটা যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। দূরে গিয়ে পড়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যমুনায় অবৈধভাবে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এর ফলে ভাঙনের তীব্রতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে।’

‘সব নদীতে চলে গেছে, শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি’

প্রশাসনকে বহুবার জানিয়েও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যায়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘এখনো নদীর দক্ষিণ অংশে ড্রেজার চলছে। নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলার কারণেই ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।’

ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে মাদরাসার সামনে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। স্থায়ী নদীশাসন ছাড়া প্রতিবছরই এভাবে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হতে থাকবে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এই চরটি সম্পূর্ণ বালুময়। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরের কোথাও শক্ত মাটির স্তর নেই। তাই প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। পুরো চরাঞ্চলকে টেকসইভাবে রক্ষা করতে হলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প হাতে নিতে হবে। আপাতত মাদরাসা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।’

সজল আলী/এসআর/জেআইএম