২৮ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপে ফিরেছে নরওয়ে। আর ফিরেই বিশ্বকাপের ডার্ক হর্সরূপে ধরা দিয়ে তারা এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ত্রাস। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে চূর্ণ করে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা কিংবা বাছাইপর্বের সব কটি ম্যাচ জিতে ইতালির মতো দলকে উড়িয়ে দেওয়া—সবখানেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এই দেশটির হুংকার।

আর্লিং হালান্ডের অতিমানবীয় গোলক্ষুধা আর মার্টিন ওডেগার্ডের জাদুকরি মস্তিষ্ক ফুটবল বিশ্বকে বাধ্য করছে নরওয়েকে নতুন করে চিনতে। কিন্তু সাড়ে ৫৫ লাখ মানুষের এই বরফাবৃত দেশ রাতারাতি কীভাবে বিশ্বকাপের বড় ‘দল’ হয়ে উঠল, সেই উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর এক অনন্য ফুটবল-দর্শনে।

নরওয়ের ফুটবল ইতিহাস কিন্তু সব সময় এমন রূপকথার মতো ছিল না। নব্বইয়ের দশকে এগিল ওলসেনের অধীনে রক্ষণাত্মক ও শারীরিক শক্তির ফুটবল খেলে তারা চমক দেখিয়েছিল। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল বা মেক্সিকোকে হারানোর কীর্তি থাকলেও, সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী দুই দশক ধরে বড় টুর্নামেন্টের যোগ্যতা অর্জন করতেই ব্যর্থ হয়েছে তারা। ২০১২ সালের ইউরোতে খেলতে না পারার পর নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন অনুধাবন করে, শুধু শরীর দিয়ে আর ফুটবলে জেতা সম্ভব নয়।

এরপরই শুরু হয় এক নীরব ফুটবল-বিপ্লব। ডিফেন্সের খোলস ছেড়ে তারা মনোযোগ দেয় আক্রমণাত্মক ও বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলে। তীব্র শীতপ্রধান দেশের প্রতিকূলতা জয় করতে দেশজুড়ে বসানো হয় পাঁচ শতাধিক আধুনিক কৃত্রিম ঘাসের পিচ।

তবে নরওয়ের এই উত্থানের আসল চাবিকাঠি তাদের সমাজ ও ক্রীড়া সংস্কৃতি। যেখানে পুরো পৃথিবী ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ওপর ট্রফি জেতার এবং সেরা হওয়ার বোঝা চাপিয়ে দেয়, নরওয়ে হেঁটেছে ঠিক উল্টো পথে। ২০০৭ সালে তারা শিশুদের জন্য আটটি মৌলিক অধিকার বাধ্যতামূলক করে।

নিয়ম অনুযায়ী, ১১ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের খেলায় কোনো ফলের তালিকা, লিগ টেবিল বা ট্রফি থাকবে না। এমনকি ১৩ বছরের আগে কোনো জাতীয় টুর্নামেন্টও খেলা যাবে না! উদ্দেশ্য একটাই—বাচ্চাদের কাছ থেকে শৈশব কেড়ে না নেওয়া, যেন তারা স্রেফ আনন্দের জন্য খেলতে পারে।

আর্লিং হালান্ড শৈশবে শুধু ফুটবল নয়, হ্যান্ডবল, অ্যাথলেটিকস ও স্কিইং করেছেন। আজ মাঠে তাঁর যে অবিশ্বাস্য শূন্যে লাফানোর ক্ষিপ্রতার দক্ষতা দেখা যায়, তা এসেছে শৈশবে বহু খেলার স্বাদ নেওয়ার স্বাধীনতা থেকে।

নরওয়ের ফুটবলের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ এক সামাজিক কাঠামোর ওপর। তাদের এলিট ফুটবল এবং তৃণমূলের ফুটবল একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশটিতে কোনো পেশাদার যুব একাডেমি নেই। হালান্ড-ওডেগার্ডের মতো তারকারা কিশোর বয়স পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন স্থানীয় ক্লাবে, সম্পূর্ণ অবৈতনিক কোচদের অধীনে।

ফেডারেশনের মূল নীতিই হলো—‘যত বেশি সম্ভব মানুষকে, সেরা পরিবেশে রাখা।’ সেরা প্রতিভাদের অল্প বয়সেই বড় ক্লাবে বিক্রি করে স্থানীয় ক্লাবগুলোকে ধ্বংস করা হয় না। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ফুটবল ক্লাব গড়ে উঠেছে। আর এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত ফসল হলো তাদের ‘ন্যাশনাল টিম স্কুল’, যা দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেরা তরুণদের চিহ্নিত করে অহংকারহীন, বিনম্র এবং দলগত ভাবনায় বিশ্বাসী এক ঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার উপহার দিচ্ছে।

ঠিক যেমনটা ব্রাজিলকে হারানোর পর হালান্ড নিজের দায়িত্বের কথাটা মাথায় রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘যখন ফুটবল খেলা শুরু করবে, তখন প্রথম যে বিষয়টি মাথায় থাকা উচিত তা হলো—তুমি নরওয়ের হয়ে খেলতে চাও। তোমার মধ্যে সেই গর্ববোধটা থাকতে হবে।’

বিশ্বকাপে নরওয়ের সমর্থকেরা যখন ভাইকিংদের মতো এক তালে বইঠা বাওয়ার ঐতিহ্যবাহী উদ্‌যাপন করেন, তখন মাঠের হালান্ড-ওডেগার্ডরাও একাত্ম হয়ে যান সেই সুরে। পেশাদার ফুটবলের করপোরেট ইঁদুরদৌড়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নরওয়ে প্রমাণ করেছে—শিশুদের ওপর জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে, বরং ডানা মেলে উড়তে দিলে বিশ্বজয় করাও অসম্ভব কিছু নয়।