একসময় মানুষ চিঠির জন্য অপেক্ষা করত দিনের পর দিন। দূরের কোনো আত্মীয়ের খবর আসত ডাকপিয়নের হাত ধরে, বিদেশে থাকা সন্তানের কণ্ঠ শুনতে পরিবারকে অপেক্ষা করতে হতো নির্দিষ্ট সময়ের টেলিফোন কলের জন্য। যোগাযোগ ছিল সীমিত, ধীর এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়সাপেক্ষ। প্রযুক্তির অগ্রগতি সেই পৃথিবীকে আমূল বদলে দিয়েছে। আজ পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে কথা বলা যায়, ছবি পাঠানো যায়, মতামত ভাগাভাগি করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।

ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা লিংকডইনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো যোগাযোগের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত দ্রুত, এত বিস্তৃত এবং এত সহজ যোগাযোগের সুযোগ মানুষ আগে কখনও পায়নি। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অর্জনের মধ্যেই একটি জটিল প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সত্যিই মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, নাকি অদৃশ্যভাবে আমাদের আরও বিভক্ত করেছে?

প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিকও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে সংযোগ সৃষ্টি। পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশি প্রতিদিন এই মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের পরিবার ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকছেন। সামাজিক আন্দোলন, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ত্রাণ সংগ্রহ, তথ্য আদান-প্রদান এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছে। রক্তদানের আহ্বান থেকে শুরু করে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সহায়তা সংগ্রহ পর্যন্ত অসংখ্য মানবিক উদ্যোগ এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে সফল হয়েছে।

বিশ্বব্যাপীও এর উদাহরণ কম নয়। আরব বসন্তের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক সচেতনতা ও গণঅংশগ্রহণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বিভিন্ন দেশে সামাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা পরিবেশগত সংকট নিয়ে জনমত গঠনে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়।

যে প্রযুক্তি মানুষকে যুক্ত করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে বিভাজনের নতুন অবকাঠামো তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকৃতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর ব্যবসায়িক মডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষের মনোযোগ। ব্যবহারকারী যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকবে, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবে এবং কোম্পানির আয় বাড়বে। ফলে অ্যালগরিদমগুলো এমন কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়, যা মানুষের আবেগকে উসকে দেয়।

সমস্যা হলো, মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ইতিবাচক তথ্যের চেয়ে বিতর্ক, ক্ষোভ, ভয় এবং সংঘাত অনেক বেশি কার্যকর। ফলে ধীরে ধীরে এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিভাজন প্রায়শই সংযোগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক যুগে নিয়ে এসেছে, যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষ একে অপরের নাগালের মধ্যে। এটি মানবসভ্যতার এক অসাধারণ অর্জন। কিন্তু সংযোগের এই বিস্ময় তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বোঝাপড়া বাড়াবে, বিভাজন নয়; সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে, বিদ্বেষ নয়; সত্যকে শক্তিশালী করবে, মিথ্যাকে নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি-র একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ মিথ্যা তথ্য সাধারণত বেশি চমকপ্রদ, আবেগনির্ভর এবং উত্তেজক হয়। ফলে মানুষ যাচাইয়ের আগে তা শেয়ার করতে আগ্রহী হয়।

বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক মতভেদ, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কিংবা সামাজিক ইস্যু নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক সময় উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। একটি পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সম্পাদিত ভিডিওকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি কনটেন্টও মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু বিভাজনের বিষয়টি শুধু ভুয়া তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরও গভীরে রয়েছে ‘ইকো চেম্বার’ বা প্রতিধ্বনি কক্ষের সমস্যা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ বিশ্লেষণ করে তাকে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখায়। ফলে একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে এমন একটি তথ্যজগতে বাস করতে শুরু করেন, যেখানে তার নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মতামতই বেশি উপস্থিত থাকে। ভিন্ন মত, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা বিপরীত যুক্তি ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

এর ফলাফল হলো মেরুকরণ। মানুষ শুধু নিজের মতকে সঠিক মনে করে না; ভিন্ন মতকেও সন্দেহ বা শত্রুতার চোখে দেখতে শুরু করে। যুক্তির জায়গা দখল করে আবেগ, আলোচনার জায়গা দখল করে সংঘাত।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রভাব নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভক্তিকে আরও তীব্র করে তুলছে।

তবে বিভাজনের আরেকটি রূপ আরও সূক্ষ্ম এবং অনেক বেশি উদ্বেগজনক—সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।

বিরোধপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবতা হলো, মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, আবার অনেক ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে বেশি একাকী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত বন্ধু বা অনুসারী থাকা মানেই বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়া নয়। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে একাকিত্ব, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মমূল্যায়ন সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক। তারা প্রায়ই নিজেদের জীবনের সঙ্গে অন্যের সাজানো-গোছানো ডিজিটাল জীবনের তুলনা করে। ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, অপ্রাপ্তির বোধ বাড়ে এবং বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল স্বীকৃতির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সময়বোধকেও বদলে দিয়েছে। আগে মানুষ খবর গ্রহণ করত নির্দিষ্ট সময় অন্তর; এখন প্রতিটি মুহূর্তে নতুন তথ্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই অবিরাম তথ্যপ্রবাহ মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিচ্ছে, গভীর চিন্তার জায়গা সংকুচিত করছে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি তৈরি করছে।

ফলে অনেক সময় মানুষ কোনো বিষয় বোঝার আগেই মতামত দিচ্ছে, যাচাইয়ের আগেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, চিন্তার আগেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, ধৈর্য এবং যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়।

তবে এই বাস্তবতার অর্থ এই নয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজেই সমস্যা। প্রযুক্তি কখনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো বা খারাপ নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে আমরা কীভাবে তা ব্যবহার করছি এবং প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

সমাধানের পথও তাই নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার।

প্রথমত, ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন নাগরিক শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। মানুষকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালে হবে না; তথ্য যাচাই, উৎস মূল্যায়ন এবং অনলাইন আচরণের নৈতিকতা সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি তথ্যকে প্রশ্ন করতে, যাচাই করতে এবং বিশ্লেষণ করতে শেখে, তাহলে সে সহজে বিভ্রান্ত হবে না।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, কোন ধরনের কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও আগের চেয়ে অনেক বেশি। পেশাদার সাংবাদিকতা আজ শুধু সংবাদ পরিবেশনের কাজ করছে না; বরং তথ্যের বিশৃঙ্খলার মধ্যে সত্যকে শনাক্ত করার দায়িত্বও পালন করছে। বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমকে শক্তিশালী করা তাই গণতন্ত্র ও সামাজিক সংহতির জন্য অপরিহার্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে থামা, উৎস যাচাই করা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের মান নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের আচরণ দ্বারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক যুগে নিয়ে এসেছে, যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষ একে অপরের নাগালের মধ্যে। এটি মানবসভ্যতার এক অসাধারণ অর্জন। কিন্তু সংযোগের এই বিস্ময় তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বোঝাপড়া বাড়াবে, বিভাজন নয়; সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে, বিদ্বেষ নয়; সত্যকে শক্তিশালী করবে, মিথ্যাকে নয়।

কারণ প্রযুক্তি মানুষকে যুক্ত করতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। প্রযুক্তি যোগাযোগের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা শেখাতে পারে না। প্রযুক্তি তথ্য পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু প্রজ্ঞা দিতে পারে না। সেই দায়িত্ব এখনও মানুষেরই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা এবং সতর্কবার্তা। এটি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব যোগাযোগের শক্তি। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা সেই শক্তিকে ব্যবহার করব সংযোগের সেতু নির্মাণে, নাকি বিভাজনের দেয়াল উঁচু করতে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রযুক্তির ওপর নয়; নির্ভর করছে আমাদের সেই সিদ্ধান্তের ওপর।

লেখক:  সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম