বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক বাহিনী–সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর প্রতি সাংবাদিক মতিউর রহমানের আগ্রহ অনেক আগে থেকেই। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা ও সম্পাদনায় যুক্ত মতিউর রহমানের অদম্য আগ্রহেই বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর বহু অজানা, রক্তাক্ত ও শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা পাঠক জানার সুযোগ পেয়েছেন। একজন অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকের মতো মতিউর রহমান সেনাবাহিনীর এসব অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। এরই সংকলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬-২০১০ গ্রন্থটি।
সুদীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোতে প্রকাশিত ১৮টি ব্যাখ্যামূলক বিস্তারিত প্রতিবেদন ও মতামতের ভিত্তিতে বইটি প্রকাশিত। সঙ্গে রয়েছে ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টার বিস্তারিত বর্ণনাভিত্তিক দুটি গভীরতর সাক্ষাৎকার। এতে উঠে এসেছে সেই সময়ের এক শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র।

বইটির শুরু ১৯৯৬ সালের মে মাসের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা দিয়ে। যে অস্থির সময়ে বাংলাদেশে প্রায় সামরিক শাসন জারি হতে যাচ্ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা ‘সেনাবাহিনীর পুরো সত্য জানতে চাই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক বিশেষ সংযোজন বলে চিহ্নিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অত্যন্ত জটিল, গণতান্ত্রিক কাঠামোও বেশ দুর্বল। যে কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে বারবার সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে। ঘটেছে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, রক্তাক্ত পালাবদল ও প্রাণহানির ঘটনা। সেনাবহিনীর বিপথগামী সদস্যদের হাতে বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন রাষ্ট্রপতি। যদিও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সংবেদনশীলতার কারণে এ বিষয়গুলোতে আলোচনা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। কিন্তু মতিউর রহমান এ ক্ষেত্রে ছিলেন ব্যতিক্রম। ১৯৯০–এর গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর নানা ঘটনাপ্রবাহের প্রতি তিনি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখছিলেন। যে কারণে ১৯৯৬ সালের টালমাটাল ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তিনি দৈনিক ভোরের কাগজে লিখেছিলেন, ‘সেনাবাহিনীর পুরো সত্য জানতে চাই’ (৬ জুন ১৯৯৬) এবং ‘সেনাবাহিনী সম্পর্কে আরও জানতে চাই’ (২৩ জুলাই ১৯৯৬) শিরোনামের দুটি ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই দুটি লেখা বিশেষ মাইলফলক। কারণ, এর আগে কখনোই রাষ্ট্রযন্ত্রে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ নিয়ে এত বিস্তারিত কোনো প্রতিবেদন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। কাজটি সাহসীও বটে। এখানেই শেষ নয়। ২০০৭ সালের এক–এগারো সরকারে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময় সাহসী পর্যালোচনা করেছেন মতিউর রহমান। ঐতিহাসিক ও শ্বাসরুদ্ধকর এসব ঘটনাপ্রবাহ স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে। বইটির মুখবন্ধে মতিউর রহমান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের এই ৫৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিধারায় আমরা দেখতে পেয়েছি, সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনী কখনো ইতিবাচক, কখনো নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এসবের মধ্য দিয়ে অনেক দুঃজনক ঘটনাও ঘটেছে। মৃত্যু হয়েছে অনেক দক্ষ সেনাসদস্য ও সেনানায়কের। স্বাভাবিক অবসর নেওয়ার সময়ের আগেই সেনাবাহিনী থেকে চলে যেতে হয়েছে অনেককে। সে কারণে দেশবাসীর কাছে বা অন্তর্জাতিকভাবেও নানা সময়ে নানা রকম সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।’ (পৃষ্ঠা: ১৪)
বইটির শুরু ১৯৯৬ সালের মে মাসের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা দিয়ে। যে অস্থির সময়ে বাংলাদেশে প্রায় সামরিক শাসন জারি হতে যাচ্ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা ‘সেনাবাহিনীর পুরো সত্য জানতে চাই’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক বিশেষ সংযোজন বলে চিহ্নিত হবে। এতে মতিউর রহমান অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবেই ১৯৯৬ সালের ১৮-২০ মে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সেনানিবাসগুলোতে আকস্মিক যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আগ্রহী পাঠক এই ঘটনাপ্রবাহে ঢুকে নিঃসন্দেহে শিহরিত হবেন। পরের দিকে ‘বাংলাদেশে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক কী হবে?’ শিরোনামের দুই পর্বের নিবন্ধে লেখক তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক অধ্যায়। ১৯৯৭ সালের ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি দুই কিস্তিতে ভোরের কাগজে প্রকাশিত এই লেখায় মতিউর রহমান জরুরি কিছু প্রশ্নও তুলেছিলেন। তিনি বলছেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআইকে (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) নতুন চিন্তায় ঢেলে সাজাতে হবে। এই সংস্থার সনদকে নতুন করে পরীক্ষা করতে হবে। মানুষকে জানতে দিতে হবে, কোন আইন দ্বারা এই সংস্থা পরিচালিত হচ্ছে।’ (পৃষ্ঠা: ৪০)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকতা বা লেখালেখি খুবই সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে মতিউর রহমান এ বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধিৎসার পরিচয় দিয়েছেন। সাহস দেখিয়েছেন। সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অজানা অধ্যায় ও অন্তরালের গল্প।
সে সময় মতিউর রহমানের এই প্রশ্নের যথাযথ জবাব পাওয়া গেলে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর খুব সম্ভবত মানবাধিকার প্রশ্নে এত সমালোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতো না।
গ্রন্থটির পরের দিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবেদনশীল সময়ে সেনাপ্রধানের নিয়োগ, শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন পদে রদবদল, মিগ-২৯ ক্রয়-বিক্রয়, অপারেশান ক্লিনহার্টসহ বেশ কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে। যেগুলো থেকে আগ্রহী পাঠক বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অজানা অধ্যায় সম্পর্কে আলোকিত হতে পারেন। পেতে পারেন ঘটনা বিশ্লেষণের নানা সূত্র।
বইটির ব্যাপ্তি ১৯৯৬ থেকে ২০১০। এই সময়ের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল এক–এগারোর পালাবদল। কিন্তু সেই সময়ের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ ও বিশ্লেষণ গ্রন্থটিতে নেই বললেই চলে। পাঠক হিসেবে এই ঘটনাপ্রবাহে সাংবাদিক মতিউর রহমানের বিশ্লেষণ আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সংস্করণে হয়তো এ বিষয়ে আরও কিছু যুক্ত হবে বলে আশা রাখছি। এ ছাড়া আলোচিত নিবন্ধগুলোতে সংবাদপত্রের কিছু কাটিং ও ছবি যুক্ত হলে গ্রন্থটি আরও সমৃদ্ধ ও পাঠকের জন্য সহজবোধ্য হতো।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকতা বা লেখালেখি খুবই সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে মতিউর রহমান এ বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধিৎসার পরিচয় দিয়েছেন। সাহস দেখিয়েছেন। সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অজানা অধ্যায় ও অন্তরালের গল্প।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬-২০১০
মতিউর রহমান
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
পৃষ্ঠা: ২৫৬; মূল্য: ৪৫০ টাকা








