ব্রাজিল মানেই ফুটবল, কফি আর সাম্বা! তা সে বিশ্ব ফুটবলের আসর হোক, আর এমনিতে ব্রাজিল নিয়ে আলোচনার আসরেই হোক—তিনটি কথা ঘুরেফিরে আসবেই। আসবে না কেন? পেলে থেকে শুরু করে হালের নেইমার, বিশ্ব ফুটবলকে অনন্য জায়গায় নিয়ে যেতে এই নামগুলোর গুরুত্ব বিশাল। তা সে আপনি যতই আর্জেন্টিনার সমর্থক হোন। আর ব্রাজিলের কফি? এ এক দারুণ কবিতার নাম। উনিশ শতক থেকে দেশটির কৃষি অর্থনীতির দারুণ এক উপকরণ হয়ে আছে কফি। বাকি রইল সাম্বা।

বর্ণাঢ্য, উজ্জ্বল ইত্যাদি বিশেষণ যোগ করা আমাদের অভ্যাস বটে। সাম্বার ক্ষেত্রে সেটি অত্যুক্তি নয়। সাম্বা শুধু একটি নাচ বা গানের ধারা, মোটকথা সংগীতধারা নয়; এটি ব্রাজিলের ইতিহাস, আফ্রিকান ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণের এক অনন্য প্রকাশ। সাম্বা ব্রাজিলের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হলেও এর শিকড় গাঁথা আছে আফ্রিকা থেকে ‘রপ্তানি’ হওয়া দাস জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে।

সাম্বার উৎপত্তি মূলত পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন নৃত্য ও সংগীত ঐতিহ্য থেকে। ষোলো থেকে উনিশ—এই প্রায় চার শ বছরের পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক আমলে লাখ লাখ আফ্রিকান দাসকে ব্রাজিলে আনা হয়। তারা নিজেদের ধর্মীয় আচার, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্য ও সংগীতের ধারা সঙ্গে নিয়ে আসে।

গবেষকদের মতে, সাম্বা শব্দটি সম্ভবত অ্যাঙ্গোলার কিম্বুন্দু ভাষার ‘সেমবা’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘নাভির স্পর্শ’ বা বিশেষ ধরনের নৃত্যভঙ্গি। এই নৃত্যরীতিই পরবর্তীকালে ব্রাজিলেন আত্মপরিচয়ের চিহ্ন হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই চিহ্ন বা প্রতীক হয়ে ওঠার পথটা ততটা মসৃণ ছিল না। বিশ শতকের শুরুর দিকে রিও ডি জেনিরোর উচ্চবিত্ত সমাজ সাম্বাকে নিম্নবিত্ত ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের সংস্কৃতি হিসেবে দেখত। ফলে ‘সাম্বা’ হিসেবে এই সংগীতের ধারা গড়ে ওঠার প্রথম দিক ছিল বেশ বিতর্কিত। এমনকি কোনো কোনো সময় সাম্বা পরিবেশনকারীদের পুলিশি হয়রানিরও শিকার হতে হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের মধ্যে চর্চিত হতে হতে রাষ্ট্র হিসেবে ব্রাজিল একসময় সাম্বাকে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ফলে এর সামাজিক মর্যাদা বাড়ে।

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সালভাদর শহর ও বাহিয়া অঞ্চলে আফ্রিকান সংস্কৃতির প্রভাব ছিল বেশি। এখানেই গড়ে ওঠে সাম্বা দে রোদা। এটিই সাম্বার প্রাচীনতম রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক সাম্বায় এর কিছু ঝলক দেখা যায় মাত্র।

সাম্বা দে রোদা নামের এই সংগীতে শিল্পীরা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গান করেন, তালি দেন এবং পালাক্রমে নাচ পরিবেশন করেন। এতে আফ্রিকান ধর্মীয় আচার ও লোকসংস্কৃতির ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ২০০৫ সালে ইউনেসকো সাম্বা দে রোদাকে মানবজাতির মৌখিক ও অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সালভাদর শহর ও বাহিয়া অঞ্চলে সাম্বা দে রোদার জন্ম হলেও আধুনিক সাম্বা বিকশিত হয় রিও ডি জেনিরো শহরে। এই শহর ১৭৬৩ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের রাজধানী ছিল। উনিশ শতকের শেষ ভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে বহু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ কাজের সন্ধানে রিও ডি জেনিরোতে চলে আসে। তাদের সঙ্গে বাহিয়ার সংগীত ও নৃত্যধারাও সেখানে রিওতে পৌঁছে যায়। এ সময় রিওর শ্রমজীবী এবং দরিদ্র এলাকাগুলোতে সাম্বা নতুন রূপ নিতে শুরু করে। আফ্রিকান ছন্দের সঙ্গে ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্র ও ব্রাজিলিয়ান লোকসংগীতের মিশ্রণে এখানেই জন্ম নেয় আধুনিক শহুরে সাম্বা।

১৯১৭ সালে রেকর্ড হওয়া ‘পেলো টেলিফোন’ শিরোনামের গানটিকে আধুনিক সাম্বার প্রথম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। এর সুরকার ছিলেন ডোঙ্গা।

সাম্বা ব্রাজিলের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, বিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে। সে সময় রিওতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাম্বা স্কুল, যারা সারা বছর নাচ, গান ও পোশাকের প্রস্তুতি নিয়ে কার্নিভ্যালে অংশ নিতে শুরু করে।

এখন বিশ্বের বড় উৎসবগুলোর একটি রিও কার্নিভ্যাল। বিশাল শোভাযাত্রা, বর্ণাঢ্য পোশাক, হাজারো নৃত্যশিল্পী নিয়ে রিওর সাম্বা মুখর করে তোলে পুরো ব্রাজিলকে। এই কার্নিভ্যাল সাম্বাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে।

বর্তমানে সাম্বার বহু উপধারা রয়েছে। যেমন সাম্বা দে রোদা, সাম্বা-কানসাও, সাম্বা-এনরেদো, পাগোদি ও বোসা নোভা। এই প্রতিটি ধারার সাম্বার রয়েছে নিজস্ব ছন্দ, বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশনার ধরন। আধুনিক ব্রাজিলিয়ান সংগীতের বিকাশেও সাম্বার প্রভাব গভীর।

আজ সাম্বা শুধু ব্রাজিলের নয়, বিশ্বসংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আফ্রিকার ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ব্রাজিলিয়ান সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই নৃত্যধারা এখনো কোটি মানুষের আনন্দ ও পরিচয়ের উৎস।

সাম্বা বর্ণাঢ্য হলেও এর জন্ম দাসপ্রথার মতো এক অমানবিক প্রথার মাধ্যমে। এই ব্যবসা পরিচালনা করত পর্তুগিজরা। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫৪০ থেকে ১৮৬০-এর দশক পর্যন্ত প্রায় ৫৫ লাখ আফ্রিকানকে ব্রাজিলে আনা হয়েছিল দাস হিসেবে। এটি আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের মোট সংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো অঞ্চল, বেনিন উপসাগর, পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা এবং মোজাম্বিকের বেশি মানুষকে ব্রাজিলে ‘আমদানি’ করা হয়েছিল দাস হিসেবে। সাম্বায় এই সব দেশ ও অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়ায় এখনো।

‘সাম্বা স্কুল’ নাম শুনে অনেকে একে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে করে। বাস্তবে এগুলো হচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠন বা কমিউনিটি ক্লাব। প্রতিটি স্কুলের নিজস্ব পতাকা, রং, সংগীত, পোশাক এবং হাজার হাজার সদস্য থাকে। তারা সারা বছর ধরে কার্নিভ্যালের প্রস্তুতি নেয়।

রিও কার্নিভ্যালে অংশ নেওয়া প্রতিটি সাম্বা স্কুল প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট থিম নির্বাচন করে। সেই থিমের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ গান রচনা করা হয়, যাকে সাম্বা-এনরেদো বলা হয়। ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি কিংবা সামাজিক আন্দোলন—সবকিছুই এসব গানের বিষয় হতে পারে।

বাহিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘সাম্বা দে রোদা’ এবং ব্রাজিলিয়ান যুদ্ধকলা সংগীত ধারা ‘ক্যাপোয়েরা’—দুটিরই শিকড় আফ্রিকান দাস সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিতে। দুই ক্ষেত্রে বৃত্তাকারে অংশগ্রহণ, গান, তাল ও বাদ্যযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তথ্যসূত্র

UNESCO: Samba de Roda of the Recôncavo of Bahia

IPAC Bahia: Samba de Roda do Recôncavo

Brasil Escola: História e características do Samba de Roda

The Guardian: Samba schools and Brazil's slavery legacy

novaresearch.unl.pt/en/publications

worldhistory.org/Portuguese_Brazil