ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে মিনি ঠিকাদার তালিকাভুক্তিকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক লেনদেনসহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদারেরা অভিযোগ করেছেন। এ দিকে এ ঘটনায় একে অপরের উপর দায় চাপাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

জানা যায়, স্বল্প দৈর্ঘ্যের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন কাজের জন্য ২০২৫ সালের ৬ মে মিনি ঠিকাদার প্রাথমিক তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ সময় আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয় ৫ হাজার টাকা এবং ১৫ মে পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়।

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি যাচাই করে দেখা যায়, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) নির্দেশিকা অনুসরণ না করেই ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি  বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকটি অতিরিক্ত শর্ত সংযোজন করে। এর মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুপারভাইজার ও লাইনম্যানের সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। 

আবেদনকারী ঠিকাদারদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে বিজ্ঞপ্তিতে এসব শর্ত যুক্ত করা হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়া একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের কারণে যোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদ্যুৎসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিজ্ঞপ্তির শর্ত মেনে নির্দিষ্ট সময়ে আবেদন জমা হয় ১৭৬টি। যাচাই-বাছাই শেষে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয় রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গ্রহণ করে সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে কাগজপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ  দেওয়া হয়নি। সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নির্দেশনা উপেক্ষা করে গোপনে পছন্দের মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক তালিকাভুক্ত করা হয়। এবং এদের মধ্য থেকে ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর গোপনে ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব রংপুরে পাঠানো হয়। 

বিষয়টি জানতে পেরে রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সব প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ পুনরায় ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে ২১ মে ৩১টির সঙ্গে নতুন করে আরও ৮টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত করে মোট ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রায় ৬ মাস থেকে চলমান পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ গোপন রাখে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

আবেদনকারী ঠিকাদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৭২টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর নতুন অনিয়ম শুরু হয়। অনুমোদনপ্রাপ্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ না দিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। অনেক ঠিকাদার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে গেলেও গ্রহণ করা হয়নি বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদারেরা অভিযোগ করেন। এ ঘটনার পেছনে তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান, ডিজিএম (কারিগরি) মো. লুৎফুল হাসান সরকার, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ইঅ্যান্ডসি) নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তোলেন তারা। 

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘পল্লী বিদ্যুতের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পূর্বে তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম শক্তি ডিজিএম। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন। তালিকাভুক্তি পুরো প্রক্রিয়া তিনিই নিয়ন্ত্রণে রাখেন। 

ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও আরাফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক বলেন, ‘‘আমি দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডারের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছি। এবারও নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে দূরের জেলার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এজিএম নাহিদ ইসলাম আমাকে উচ্চ মহলের সুপারিশ আনতে বলেছিলেন। এরা খুব বড় একটা সিন্ডিকেট।’’

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক তদ্বির ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনামুল হক বলেন, ‘‘সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন জমা দিতে গেলে অনেকের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি এবং বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।’’

রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নির্দেশ অমান্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘‘সেখানে ইঞ্জিনিয়াররাই বিষয়টি দেখাশোনা করেন। আমি চলে আসার চার-পাঁচ মাস হয়ে গেছে। বিষয়টি আমার মনে নেই। আমি চলে আসার পর সেখানে আরও একজন জিএম ছিলেন, তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।’’

এসব অভিযোগের বিষয়ে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ইঅ্যান্ডসি) নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ডিজিএম (কারিগরি) মো. লুৎফুল হাসান সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘‘ঠিকাদার তালিকাভুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হ্যান্ডেল করেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই। যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমি শুধু একজন সদস্য ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। আর সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য অন্যদের কাগজপত্র গ্রহণ না করার বিষয়টি অফিস প্রধানের এখতিয়ার। এখানে আমার কিছু করার ছিল না।’’

বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার মো. আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘‘মিনি ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি অতীতের। ১৭২টি আবেদনের মধ্যে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে। আগে কীভাবে হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’’

অনিয়ম দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, ‘‘আমি নতুন করে আর কোনো কাগজপত্র জমা নেব না। তবে অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’’

অন্যদিকে রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘‘মোট ১৭৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সঠিক থাকায় প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর জিএম শাখাকে সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠায়। পরে আমরা সব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম।’’

‘‘আমাদের কোথাও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা নেই। যারা প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হয়েছেন, তারা যে কোনো সময় সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য কাগজপত্র জমা দিতে পারেন। বর্তমানে নতুন করে কাগজ জমা না নেওয়ার কোনো কারণ নেই,’’ যোগ করেন তিনি। 

এই নির্দেশনা অমান্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমার কাছে অভিযোগ এসেছে। কিন্তু লিখিত ও কোনো রেকর্ড প্রমাণ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছি না। আমি দুইবার নির্দেশনা দিয়েছি, কিন্তু তারা তা বাস্তবায়ন করেনি। কেন গড়িমসি করছে, সেটি আমার জানা নেই। ১৭২টি প্রতিষ্ঠানই সাময়িক তালিকাভুক্ত হলেও কোনো সমস্যা নেই। যার ইচ্ছা সে কাজ করবে। ঠিকাদারের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।’’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত রাখলে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার প্রায় ২০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎসেবায় ভোগান্তির মুখে পড়বেন। বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অযৌক্তিক বিলম্ব, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং গ্রাহক হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিবছর নবায়ন ফি থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে ঘুষ, অতিরিক্ত বিল আদায়, টেন্ডার অনিয়ম, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়া সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বিধি অনুযায়ী সাময়িক তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।