কখনও ঐতিহ্য, কখনও শহুরে জীবন বা শিল্প ও কল্পনার মেলবন্ধন। শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির গ্র্যাজুয়েশন ফ্যাশন শোয়ে প্রতিটি কালেকশনই বলেছে আলাদা সব গল্প।
সেলাইয়ে শুধু পোশাক তৈরি হয় না, কখনও কখনও সেটি হয়ে ওঠে স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যম । সে গল্প ঐতিহ্যের, সংস্কৃতির, কখনো ডিজাইনারের কল্পনার। আবার হতে পারে আধুনিক শহুরে ও সমসাময়িক যাপনের। এমনই সব গল্পে সাজানো ছিল শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির (এসএমইউসিটি) ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি (এফডিটি) বিভাগের ৪৪তম গ্র্যাজুয়েশন ফ্যাশন শো।

১১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার বিজিএমইএ কমপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল 'এভরি স্টিচ টেলস আওয়ার স্টোরি’। গ্র্যাজুয়েশন কালেকশন প্রতীয়মান ছিল ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চার বছরের শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও কারিগরি দক্ষতা। পাঁচটি পৃথক থিমে উপস্থাপিত হয় তাঁদের সৃজনভাবনা। প্রতিটি কিউয়ে মূল পোশাকের সঙ্গে ছিল একটি বিশেষ থিমে তৈরি পোশাক। এই বিশেষ আউটফিটকে তাঁরা শোস্টপার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দ্য আরবান গ্রেস: শহুরে জীবনের সহজ সৌন্দর্য

নাম শুনেই বোঝা যায়, প্রথম কিউয়ের অনুপ্রেরণা আধুনিক নগরজীবন। ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই পোশাকে তুলে ধরা হয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য, আত্মবিশ্বাস ও পরিশীলিত রুচি।
কো-অর্ড সেট, ব্লেজার, জ্যাকেট, শার্ট, ড্রেস ও ট্রাউজার্সে নিখুঁত টেইলরিং, ফ্লুইড সিলুয়েট, স্ট্রাকচা্ররড ডিটেইলিংয়ের সমন্বয় দেখা যায়। কাট–প্যাটার্ন ও লাইনের বৈচিত্র্য নজর কেড়েছে।

এই কিউয়ের শোস্টপার ছিল ম্যাক্রেম অনুপ্রাণিত কালেকশন ‘নটেড হরাইজনস’। ম্যাক্রেম কাফতান, ব্যারল প্যান্ট, ওয়াইড লেগড প্যান্ট ও হল্টারনেক বিডেড টপে র্যাম্প মাতান মডেলরা।
থ্রেডস অব হেরিটেজ: লোকঐতিহ্যের নতুন ভাষ্য

এই পর্বে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যকে আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় নতুনভাবে তুলে ধরেছেন। গাজীর পট, নকশি পিঠা, বাংলার প্রকৃতি, গ্রামীণ দৃশ্য, টেরাকোটা, যামিনী রায়ের আর্ট, টেপা পুতুল ইত্যাদি চিরায়ত মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে এই কিউয়ের পোশাকে।

অলংকরণে মাধ্যম হয়েছে হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, ডিজিটাল আর্টওয়ার্ক, ডিজিটাল এমব্রয়ডারি, সাবলিমেশন প্রিন্ট, হাতের কাজ ও অ্যাপলিকে।

টেকসই ফ্যাশনের বার্তাও উঠে এসেছে এই কিউতে। এক শিক্ষার্থী প্রিয়জনদের পুরনো শাড়ি ও ওড়নাকে রংপুরের তাঁতিদের সহায়তায় নতুন সুতা ও ফেব্রিকে রূপ দিয়েছেন। এই নতুন কাপড়ে তৈরি কালেকশনটি হয়েছে দ্বিতীয় কিউয়ের শোস্টপার।
স্ট্রিট সিম্ফনি: পথই যখন প্রেরণা

শহরের দেয়ালচিত্র, স্থাপত্য, তরুণদের সংস্কৃতি ও বহুসাংস্কৃতিক জীবনধারা থেকে অনুপ্রাণিত এই সংগ্রহে ছিল সাহসী নিরীক্ষা। পিলো লাভা, গ্রাফিতি, ওয়েস্টার্ন স্পিরিট থিমে সাজানো এই কিউ। ওভারসাইজড সিলুয়েট, লেয়ারিং, কালার ব্লকিং, ইউটিলিটি ডিটেইল, প্যাচওয়ার্ক ও নিরীক্ষাধর্মী টেইলরিং স্ট্রিটওয়্যারকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ভেলভেট, লেদারসহ ফেব্রিকে বৈচিত্র্য ছিল।

এখানে শো স্টপার কালেকশন ছিল ’ফ্রিডম টু ফিল’। পপ আর্ট প্রাণিত এই কালেকশনে উজ্জ্বল রং ও মোটিফের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তুলে ধরা হয়েছে। সাবলিমেশন প্রিন্ট, প্যাচওয়ার্ক ও কারচুপির সমন্বয় পোশাককে দিয়েছে ত্রিমাত্রিক সৌন্দর্য।
মুনলিট এলিগ্যান্স: রাতের আভিজাত্যের গল্প

মোজাইক, কিনসুগি আর্ট, ইজনিক সিরামিক, স্কাই, ওশান ওয়েভস থিম উপস্থাপিত হয় এই কালেকশন। স্যাটিন ও আর্টিফিশিয়াল সিল্কে তৈরি নাটকীয় গাউন, কেপ, স্কাল্পচারড বডিস ও ভলামনাস স্কার্ট ছিল এই কিউতে। ফ্লোরাল অ্যাপলিকে, সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, ড্রেপিং ও এমবেলিশমেন্ট বেশ চোখে পড়েছে।

শোস্টপার ছিল ‘হেরিটেজ হুইসপার্স’। এর অনুপ্রেরণা ঐতিহাসিক অ্যাম্বার প্যালেস। প্রতিটি পোশাকে ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তরুণ ডিজাইনাররা।
ইটারনাল ব্লুম: উৎসব ও কনের সাজে নতুন ব্যাখ্যা

শেষ কিউটি দৃষ্টি কেড়েছে রাজকীয় সব পোশাকে। ফেস্টিভ ও ব্রাইডালওয়্যারের এই সংগ্রহে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ছিল স্পষ্ট। বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশাকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠন করে ব্রাইডাল সিলুয়েট, লেয়ারিং ও প্যাটার্নে ব্যবহার করেছেন ডিজাইনাররা। সুজানি, কলমকারি, তাজমহল, বনবিবি ইত্যাদি মোটিফ ফুটে উঠেছে নকশায়। বেনারসি, স্যাটিন, আর্টেফিশিয়াল সিল্কে এমব্রয়ডারি, কারচুপি ও জরির কাজ করা হয়েছে। মেরুন ও সোনালির ব্যবহার পুরো কালেকশনে এনেছে রাজকীয় আবহ।

শোস্টপার ছিল লেহেঙ্গা–ক্রপ টপ কালেকশন। ফ্যাশন শো কোরিওগ্রাফ করেছেন এই বিভাগেরই শিক্ষার্থী আরবিন তপু। প্রশংসা করার মতো আরেকটি বিষয় হচ্ছে কিউতে অংশ নেওয়া কেউই পেশাদার মডেল নন; বরং তাঁরাও এফডিটির শিক্ষার্থী।
আয়োজনের অতিথিবৃন্দ

শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনী ছাড়াও ৪৪ তম গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন অতিথিরা। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো–ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. লুৎফুর রহমান। এছাড়াও এসএমইউসিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুল হক, রেজিস্টার ড. মশিউর রহমান, উপাচার্য শাহ–ই–আলমসহ ৪২তম গ্র্যাজুয়েশন ফ্যাশন শোতে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন স্বানমখ্যাত ডিজাইনার ও তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের প্রাক্তনরাও ছিলেন এই আয়োজনে। তাঁরা অনুজদের কাজ দেখেছেন আর নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন। বিভাগের শিক্ষক, অভিভাবক ও অন্যান্য আবর্তনের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
ছবি: আয়োজক








