নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফ-এর বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসেছে। আজ থেকে ১৬ জুলাই-পাঁচ দিনের এই সফরে প্রতিনিধিদলটি অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিকল্পনা কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে। বিএনপি সরকার নতুন করে ৪৫০-৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি চায়। এবারের বৈঠকে ঋণের পরিমাণ, কিস্তিছাড়ের সময়সূচি এবং সংস্কারের রোডম্যাপ নিয়ে এ সফরেই প্রাথমিক আলোচনা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা যায়, আইএমএফ নতুন করে ঋণচুক্তির আগে কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায়। সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সংকটকালে সরকার কীভাবে বিশাল বাজেট ঘাটতি সামাল দেবে, সেই রোডম্যাপ দেখতে চায় সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের বাস্তবসম্মত কৌশল জানতে চাইবে আইএমএফ। এনবিআর কীভাবে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াবে, কর ফাঁকি রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং শুল্ক রেয়াত কমানোর রোডম্যাপ কী, তা নিয়ে এনবিআর-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘নবম পে-স্কেল’ নিয়ে সরকারের ওপর তীব্র চাপ রয়েছে। তবে আইএমএফ-এর নীতি হলো সরকারি ব্যয় যৌক্তিককরণ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ কমানো। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের পরিচালন ব্যয় কতটা বাড়বে এবং তা বাজেট ঘাটতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট হিসাব ও যৌক্তিকতা জানতে চাইবে প্রতিনিধিদলটি। এছাড়া তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কেমন হবে, তার একটি রূপরেখাও দেখতে চায় সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া ঋণের আগের চুক্তিটি বাতিল বা স্থগিত করা হলেও নতুন আলোচনার টেবিলে শর্তের ক্ষেত্রে খুব একটা নমনীয় হচ্ছে না আইএমএফ। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগের বেশির ভাগ শর্তই নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে সংস্থাটি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ, বিশাল ঘাটতি অর্থায়ন, রাজস্বনীতি, বৈদেশিক অনুদান, বহুল আলোচিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনার বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাইবে ঢাকা সফরে আসা মিশনটি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালে নেওয়া ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার নতুন বাস্তবতায় একটি পৃথক ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের যুক্তি-রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব সংকটের কারণে আগের কর্মসূচির অনেক শর্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাই নতুন চুক্তিতে বাস্তবসম্মত এবং ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মসূচি নতুন হলেও আইএমএফ-এর মৌলিক সংস্কার এজেন্ডায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগের বেশির ভাগ শর্তই নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নতুন কর্মসূচি মানেই শর্ত শিথিল হবে-এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। আইএমএফ সব সময়ই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়। সরকার যদি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা দেখাতে পারে, তাহলে সংস্কার বাস্তবায়নের সময়সূচিতে কিছুটা নমনীয়তা আসতে পারে। কিন্তু মূল সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। তিনি বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জানা যায়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফ-এর আগের অনেক শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি তাদের মৌলিক অবস্থান থেকে খুব বেশি সরছে না বলে আভাস পাওয়া গেছে। আগের সরকারের আমলে ৪৭০ কোটি ডলারের যে ঋণ কর্মসূচি চলছিল, তার অনেক শর্তই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। নতুন ঋণচুক্তির আলোচনায় আইএমএফ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আর্থিক খাতের সুশাসন, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ভর্তুকি হ্রাসের মতো কাঠামোগত সংস্কারের শর্তগুলো বহালই থাকছে। বরং নতুন বাস্তবতায় শর্তের পরিধি আরও সুনির্দিষ্ট ও কঠোর হতে পারে। মূলত সদ্য ঘোষিত ও বাস্তবায়নাধীন চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের উৎসগুলো খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি।








