প্রতি বছরের মতো এবারো দেশের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ আর্থিক বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। কৃষিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবার সরকারের বিনিয়োগ প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। বছরের পর বছর সর্বোচ্চ বাজেট আসার পরও পূরণ হয় না শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু প্রয়োজনীয় চাহিদা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অপ্রাপ্তি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন অনুষদের একাধিক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে সড়কবাতির অপর্যাপ্ততা, নিরাপত্তা সংকট, পরীক্ষাকক্ষে আসনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজেদের ভোগান্তি তুলে ধরেছেন তারা।
সড়কবাতির অপর্যাপ্ততার ব্যাপারে পশুপালন অনুষদের শিক্ষার্থী রেজোয়ান হোসেন বলেন, টিউশনি করার জন্য দেখা যায় বেশ রাত করে হলে ফিরি। সেক্ষেত্রে দেখা যায় জব্বারের মোড় থেকে আমাদের সোহরাওয়ার্দী হলের রাস্তা অন্ধকারে ছেয়ে থাকে। ওইসব জায়গায় বহিরাগত মানুষের আনাগোনা বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে চুরি-ছিনতাইজনিত ভয় কাজ করে।
পরীক্ষাকেন্দ্রে বসার অব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষি অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফিয়া মোবাশ্বিরা বলেন, আমাদের সব ফাইনাল পরীক্ষা করিম ভবনে হয়, যেখানে আমাদেরকে কাঠের হাতল লাগানো একটি চেয়ার দেওয়া হয়। হাতলের ওই অংশটুকুতেই পরীক্ষার খাতাসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি রাখতে হয়, যেখানে সম্পূর্ণ খাতাটি রাখাই কষ্টসাধ্য। অন্য জিনিসপত্র কিছুই রাখতে পারি না। বার বার কলম ও প্রশ্নপত্র পড়ে যায় এবং এগুলোতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।
একই সমস্যার কথা উল্লেখ করেন কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একাধিক শিক্ষার্থী। প্রত্যেকের চাওয়া চেয়ারের পরিবর্তে সমতল বেঞ্চ বা গ্যালারির ব্যবস্থা করা।
অন্যদিকে হল, অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে দিন দিন বেড়ে চলেছে সাইকেল, ফোন ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনা।
সম্প্রতি চুরির ঘটনায় ভুক্তভোগী কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী আব্দুল মুকিত বলেন, কিছুদিন আগেই আমাদের রুমের জানালা কেটে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরি হয়। পরবর্তীতে হল প্রশাসনের কাছে সাহায্যের আবেদন করলে তারা উল্টো আমাদের ওপরই দোষ চাপিয়ে দেয়। হল থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের চুরির ঘটনা ঘটলেও সেটার উপযুক্ত কোনো তদন্ত হয় না।
একই অনুষদের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম সাকিব তার ক্যাম্পাস জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ক্যাম্পাসে আসার প্রায় ৫ বছর হতে চললো, এই দীর্ঘ সময়ে কত বাজেট এসেছে গেছে কিন্তু কিছু জটিল সমস্যা আজও রয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সাইকেল চুরি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীর অভাব, গুরত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরার অভাব, বলতে গেলে হয়ত শেষ হবে না।

একই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খালেদা জিয়া হলের প্রথম বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, বিশেষ করে কৃষ্ণচূড়া রোডে কোনো নিরাপত্তাকর্মী থাকে না বললেই চলে। এ বিষয়ে আমরা হল প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাইনি। পাশাপাশি ওই রাস্তায় আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, যার কারণে রাতে চলাচলে আমাদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থান পরিদর্শন করে সড়কে পর্যাপ্ত আলোর সংকট চোখে পড়ে। দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, করিডোর সন্ধ্যার পরই আঁধারে ছেয়ে যায়। এতে যেমন মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্নতা বাড়ছে তেমনি অনৈতিক কাজও চোখে পড়ে। হরহামেশাই সন্ধ্যার পর বহিরাগতদের ওইসব স্থানে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
পরীক্ষা কেন্দ্রে বসার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জি.এম. মুজিবর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের এটাতে সমস্যা অনুভব হলেও আমার কাছে সরাসরি এটা নিয়ে কোনো প্রস্তাবনা আসেনি। এখন যেহেতু ব্যাপারটা উঠে এসেছে যে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে পরীক্ষা দিতে সমস্যা হচ্ছে, তাহলে অবশ্যই এটা পরিবর্তন করা নিয়ে আমি কথা বলবো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আলোক সংকটের ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগের এডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী মোহা. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় দেখা যায় বজ্রপাতের কারণে বিভিন্ন স্থানের লাইটগুলো কেটে যায়। আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি যে কোথায় কোথায় এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। করিডোরগুলোতে ৯ বা ১২ ওয়াটের লাইট লাগানো আছে, চেষ্টা করছি এগুলোর পরিবর্তে আরও অধিক পাওয়ারের লাইট লাগানো যায় কি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কগুলোর ক্ষেত্রে আলোর পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ পোল সংখ্যা সীমিত। নতুন করে পোল স্থাপন করা গেলে অবশ্যই সড়ক আরও আলোকিত করা সম্ভব।
ক্যাম্পাসে চুরি এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরাও চিন্তিত। আমাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমরা শিক্ষার্থীদেরও সহযোগিতা কামনা করছি যেন কিছু কিছু বিষয়ে তারাও সচেতন হয়। হরহামেশাই দেখা যায় তারা রাত করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অসতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করে, যেটা আমরা চাইলেও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বন্ধ করতে পারব না। শিক্ষার্থীরা তাদের যেকোনো ধরনের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হলে আমরা অবশ্যই সেটা সমাধানের চেষ্টা করি এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
এফএ/এএসএম








