ভারতের কর্ণাটকের ধরওয়াড়ে ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিজের ফ্ল্যাট থেকে ডা. কিরণ হোনান্নাভার (৪৫) নামের এক অ্যানেসথেটিস্টের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ঘর থেকে তাঁর আট বছর বয়সী সন্তানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি রহস্য তৈরি করেছে ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী ডা. প্রিয়াঙ্কার আচরণ।
পুলিশ ও স্বজনেরা যখন ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন দেখা যায় স্বামী ও সন্তানের রক্তে ভেজা মরদেহের পাশে খাটে শুয়ে নির্লিপ্তভাবে নিজের মোবাইল স্ক্রল করছেন তিনি। আজ বৃহস্পতিবার কর্ণাটক পুলিশের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ইন্ডিয়া টুডে।
স্থানীয় পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত ডা. কিরণ হোনান্নাভার ধরওয়াড়ের চিরায়ু হাসপাতালের একজন অভিজ্ঞ অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা কাট্টানাহাল্লি এবং আট বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে পবন হাই স্কুলের বিপরীতে অবস্থিত একটি অভিজাত বহুতল আবাসন কমপ্লেক্সের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। স্ত্রী প্রিয়াঙ্কাও একজন চিকিৎসক। তিনি এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর চক্ষুবিদ্যায় এমএস ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে ডা. কিরণের স্বজন ও বন্ধুরা তাঁকে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাচ্ছিলেন না। প্রতিবারই ফোন ধরছিলেন স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা। প্রথমে তিনি স্বজনদের জানান, তাঁর স্বামী বিশ্রাম নিচ্ছেন। পরদিন সকালে জানান, তিনি ডিউটির জন্য বাইরে গেছেন। প্রতিবেশীরাও যখন খোঁজ নিতে যান, তখন প্রিয়াঙ্কা দরজা না খুলেই ভেতর থেকে বলেন যে তাঁর স্বামী বাসায় নেই। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কিরণ নিখোঁজ থাকায় সন্দেহ দানা বাঁধে স্বজনদের মনে। এরপর তাঁরা সরাসরি ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে হুব্বাল্লি-ধরওয়াড়ের পুলিশ কমিশনার এন শশীকুমার পুলিশের একটি বিশেষ দল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাও। পুরো ফ্ল্যাটের মেঝেতে রক্ত লেপ্টে ছিল। একটি ঘর থেকে ডা. কিরণের রক্তাক্ত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর শরীরে একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। অন্য একটি ঘরে তাদের আট বছর বয়সী সন্তানকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
উদ্ধারকারীরা প্রথমে ভেবেছিলেন শিশুটি মারা গেছে। কিন্তু পুলিশ কমিশনার শশীকুমার লক্ষ্য করেন, শিশুটির বুক তখনো ওঠানামা করছে এবং সে শ্বাস নিচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিলম্ব না করে রক্তাক্ত শিশুটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এতসব ঘটনার মাঝে সবচেয়ে স্তম্ভিত করার মতো বিষয় ছিল, ফ্ল্যাটের এই রক্তাক্ত ও বীভৎস পরিস্থিতির মধ্যেই অভিযুক্ত স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা খাটের ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে পুলিশ ও উপস্থিত স্বজনদের চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়।
পুলিশ কমিশনার এন শশীকুমার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তান ছাড়া বাইরের কোনো তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশের চিহ্ন বা জোরপূর্বক দরজা ভাঙার কোনো প্রমাণ মেলেনি। ফলে প্রিয়াঙ্কাই এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ধারণা করছে পুলিশ।
এদিকে প্রিয়াঙ্কাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি মানসিক ট্রমা বা শকের মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেন এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। তিনি পুলিশকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানসিক অবসাদের ওষুধ খাচ্ছেন এবং ঘটনার পর কী করবেন বুঝতে না পেরে চুপচাপ বসেছিলেন।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঠিক কী কারণে এবং কোনো পারিবারিক কলহের জেরে একজন চিকিৎসক তাঁর স্বামী ও সন্তানকে এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা ও জখম করতে পারেন, তা উদ্ঘাটনে পুলিশ পুরো ফ্ল্যাটের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে।








