রাজধানীর মিরপুর রোডের কল্যাণপুর এলাকায় অস্ত্রের মুখে অপহরণ, নির্যাতন ও ছিনতাইয়ের শিকার বাবা-ছেলের ঘটনায় এবার সামনে এসেছে নতুন অভিযোগ। ভয়াবহ ওই ঘটনার পর মামলা করতে গিয়ে পুলিশি হয়রানির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মো. মাহফুজুর রহমান সরকার। অন্যদিকে ঘটনার পর থেকে তিনি ও তার স্কুলপড়ুয়া ছেলে এখনো মানসিক ট্রমায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগী মাহফুজুর রহমান জানান, ২ জুলাই রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি মোটরসাইকেলে করে ছেলে মো. মাহরুছ রহমান সরকারকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে সবুজবাগের বাসায় ফিরছিলেন। পথে কল্যাণপুরে দারুস সালাম জামে মসজিদের নিচে একটি দোকানে পানি কিনতে থামেন। পানি কিনে মোটরসাইকেল চালু করার মুহূর্তেই এক ব্যক্তি তার কোমরে পিস্তল ঠেকায় এবং একই সময়ে আরও কয়েকজন এসে তাদের ঘিরে ফেলে।
এরপর অস্ত্রের মুখে বাবা-ছেলেকে পাশের একটি গলি দিয়ে একটি পুরোনো ভবনের চিলেকোঠায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছেলের সামনে বাবাকে শারীরিক নির্যাতন করে চক্রের সদস্যরা। মোবাইল ফোন, ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট তল্লাশি করা হয়। পর্যাপ্ত টাকা না পেয়ে পরিচিতজনদের কাছে ফোন করে টাকা জোগাড় করতে চাপ দেওয়া হয়। পরে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এনে দিতে বাধ্য হন মাহফুজুর রহমান।
সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ছেলের সামনে বাবার ওপর নির্যাতনের দৃশ্য। মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাকে মারধর করার সময় আমার ছেলে আতঙ্কে বমি করে ফেলে। পরে ওকে পাশের একটি কক্ষে রাখা হলেও আমার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিল। আমি বারবার অনুরোধ করেছি, ছেলেটার সামনে যেন কিছু না করে। তার দাবি, চিলেকোঠায় ছয় থেকে সাতজন ব্যক্তি ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র এবং দেশীয় অস্ত্র ছিল। তারা দুজনকে ‘কাকা’ ও ‘ক্যাপ্টেন’ বলে সম্বোধন করছিল এবং তাদের নির্দেশেই পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাবা-ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তাদের মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ও মোটরসাইকেল রেখে দেওয়া হয়। একটি সিএনজিতে তুলে দেওয়ার আগে ঘটনা কাউকে জানালে পরিবারসহ হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহরুছ রহমানের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সে কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে না, রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠছে এবং আতঙ্কে কেঁপে উঠছে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন সিসিইউতে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। অন্যদিকে মাহফুজুর রহমানও নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছেন।
এ ঘটনার পর শনিবার দারুস সালাম থানায় মামলা করতে গিয়ে নতুন ভোগান্তির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তাকে থামকি দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে পুলিশের সঙ্গে সেখানে যান। কিন্তু ভবনের সামনে গিয়ে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলা হয়। তিনি ভয়ে রাজি না হলে সঙ্গে থাকা এক এএসআই ও একজন কনস্টেবল তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেন এবং টানাহেঁচড়া করেন বলে অভিযোগ করেন।
মাহফুজুর রহমানের ভাষ্য, ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থানকালে তিনি ছিনতাইকারী দলের একজন সদস্যকে দেখতে পান। এতে তিনি আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে কল্যাণপুরে একটি বাস কাউন্টারে আশ্রয় নেন। পরে থানায় ফিরে মামলাসংক্রান্ত কার্যক্রম শেষ করেন। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত থানায় অবস্থান করার পর তার এজাহার লেখা শেষ হয় বলে জানান তিনি।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার না করে দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজমুল হক খান বলেন, ‘মামলার তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থলে যাওয়া প্রয়োজন। যদি কোনো পুলিশ সদস্য তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে থাকে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনাস্থলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ভবনটির সিসিটিভি ফুটেজও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এ বিষয়ে দারুস সালাম থানার ওসি মো. দুলাল হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে, তবে চিলেকোঠায় যাওয়া হয়নি এবং সিসিটিভি ফুটেজও এখনো পরীক্ষা করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগীর সঙ্গে কোনো অসদাচরণ হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। মামলার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।








