চলচ্চিত্রকে শুধু বিনোদন বা সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম হিসেবে না দেখে, একে একটি শক্তিশালী উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে সিনেমা খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে এ খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।

শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: স্লোগান নাকি সম্ভাবনা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।

ওয়েবিনারে চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বলেন, “বাংলাদেশের চলচ্চিত্র খাতকে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, পোস্ট-প্রোডাকশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স) ও ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্পকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে এ খাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।”

তার মতে, “যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে দেশের চলচ্চিত্র ও কনটেন্ট শিল্পের বাজার ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। এতে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয়ও ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।”

দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্র শিল্পকে কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করার পর দেশটি আজ বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশও পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একই ধরনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।”

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, “দেশীয় ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছেন। এক কোটি টাকার একটি কনটেন্ট তৈরিতে প্রায় ২৭ লাখ টাকা কর পরিশোধ করতে হলেও বিদেশি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের বাস্তবতা নেই। ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।”

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। পেপাল বা স্ট্রাইপের মতো সেবা চালু না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতে হয়, যা দেশের বৈদেশিক আয়েও প্রভাব ফেলছে।”

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “সৃজনশীল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক নীতিমালা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ। দেশে এ খাতের জন্য পর্যাপ্ত বাজার ও ভোক্তা রয়েছে। সরকারি সহযোগিতা বাড়লে এটি অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।”

তিনি বলেন, “শিল্পকলা একাডেমির মতো রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও আয়মুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। সৃজনশীল শিল্পের বিকাশে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণেরও প্রয়োজন রয়েছে।”

ওয়েবিনারে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী সৃজনশীল শিল্পের উন্নয়নে একটি কেন্দ্রীয় কমিশন গঠন এবং শিল্পীদের মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন প্রকাশনা খাতে ডিজিটাল পাইরেসি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

এছাড়া নাট্যকার ও অভিনেতা বাকার বকুল এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আবদুস সালামও সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে নীতিগত সংস্কার, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।