বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দ্রুত বংশবিস্তার করে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশুদের ওপর, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে এই সময়ে ডায়েরিয়া, পেটের সংক্রমণ, বমি ও খাদ্যজনিত নানা অসুস্থতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষায় শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা জরুরি। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সময় রোটাভাইরাস ও নোরোভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বাসি খাবার এসব ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি সম্প্রতি ‘হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-এফ’ নামের এক ধরনের অ্যাডিনোভাইরাসও শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।
আরও পড়ুন
বৃষ্টির দিনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা খাবেন
তাই বর্ষার সময়ে নিচের খাবারগুলো শিশুদের না দেওয়াই নিরাপদ...
রাস্তার কাটা ফল ও রঙিন শরবত
ফুটপাতে কেটে রাখা ফল বা খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া বিভিন্ন রঙের শরবতে সহজেই ই-কোলাই ও সালমোনেল্লার মতো ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া জন্মাতে পারে। এগুলো খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়েরিয়া এমনকি টাইফয়েড বা জন্ডিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বাজার থেকে আনা ফল ভালোভাবে ধুয়ে কিছু সময় লবণ মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর পরিষ্কার করে শিশুকে দিন। স্কুলের টিফিনে সম্ভব হলে কাটা ফলের বদলে আস্ত ফল দিন।
অর্ধসিদ্ধ ডিম বা মাংস
বর্ষায় ডিম ও মাংসে সালমোনেল্লা ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই এগুলো অবশ্যই ভালোভাবে সিদ্ধ বা উচ্চতাপে রান্না করে খাওয়াতে হবে। এ সময় অর্ধসিদ্ধ ডিম, কম রান্না করা মাংস কিংবা দোকানের ফ্রোজেন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার শিশুদের না দেওয়াই ভালো।
আরও পড়ুন
জলাবদ্ধ পানিতে হাঁটলেন? বাসায় ফিরেই করুন এই কাজ
সামুদ্রিক মাছ
চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ বর্ষাকালে দ্রুত দূষিত হতে পারে। কিছু সামুদ্রিক মাছে এ সময় বিষাক্ত উপাদান বা টক্সিন জমার ঝুঁকিও থাকে, যা খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। সামুদ্রিক মাছ রান্না করলে ভালোভাবে পরিষ্কার করে সম্পূর্ণ সিদ্ধ করুন। দীর্ঘদিন ফ্রিজে সংরক্ষণ করা সামুদ্রিক খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। এর পরিবর্তে টাটকা দেশি বা ছোট মাছ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
কাঁচা সালাদ
বর্ষার সময়ে বাঁধাকপি, লেটুস, পালংশাকসহ বিভিন্ন পাতাজাতীয় সবজিতে ছত্রাক, পরজীবী বা ফিতাকৃমির ডিম থাকতে পারে। শুধু পানি দিয়ে ধুলে সবসময় এগুলো পুরোপুরি দূর হয় না। এসব সবজি খেতে হলে লবণ মেশানো গরম পানি বা ভিনিগার মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে রান্না করে পরিবেশন করুন। কাঁচা সালাদের বদলে সবজির স্যুপ বা স্ট্যু শিশুদের জন্য বেশি নিরাপদ।
প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
চিপস, কুকিজ, নাচোস, চকোলেটের পাশাপাশি সসেজ, হটডগ, বেকন, সালামির মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসজাত খাবার বর্ষায় শিশুদের জন্য ভালো নয়। এসব খাবার হজমের সমস্যা ও পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিকল্প হিসেবে ঘরে তৈরি ওটস, ডালিয়া, কিনোয়া বা চিঁড়ার স্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন
চা-কফি ছাড়াও সারাদিন সতেজ থাকার সহজ উপায়
কার্বোনেটেড কোমল পানীয়
গ্যাসযুক্ত কোমল পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম উপাদান থাকে, যা হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এসব পানীয় শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্ষায় শিশুকে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর পানীয় দেওয়াই ভালো।
ফ্রিজে রাখা পুরোনো খাবার
২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ফ্রিজে রাখা ভাত, ডাল, তরকারি, পাউরুটি বা কেক ছোটদের না খাওয়ানোই নিরাপদ। ফ্রিজ থেকে বের করার পর খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এলে তাতে ব্যাক্টেরিয়া বা ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। বর্ষাকালে তাই যতটা সম্ভব টাটকা রান্না করা খাবারই শিশুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন
ভ্রমণে যাচ্ছেন? ডেঙ্গুর মৌসুমে যেসব সতর্কতা জরুরি
বর্ষায় শিশুদের সুস্থ রাখতে আরও কিছু পরামর্শ
- সবসময় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করান।
- খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- খাবার ঢেকে রাখুন এবং রান্নাঘর পরিষ্কার রাখুন।
- শিশুদের বাইরে থেকে কেনা খোলা খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করুন।
সামান্য সচেতনতাই বর্ষাকালে শিশুদের ডায়েরিয়া ও অন্যান্য পেটের সংক্রমণ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারে।
জেএস/








