স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এখন অনেকেরই দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে যুক্তরাজ্যের মারিওসের ক্ষেত্রে তা রীতিমতো আসক্তিতে পরিণত হয়েছিল। দিনে কখনও কখনও ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ফোনে কাটাতেন তিনি। এখন সেই আসক্তি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে থেরাপির সাহায্য নিচ্ছেন।
মারিওস জানান, ফোনের নোটিফিকেশন উপেক্ষা করা তার কাছে ছিল অত্যন্ত কঠিন। থেরাপি চলাকালে একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা এলেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেওয়ার তীব্র তাগিদ অনুভব করেছিলেন। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
তার ভাষায়, মনে হতো যেন নিজের পকেটেই একজন মাদক বিক্রেতাকে নিয়ে ঘুরছি। ফোন সব সময় আলো জ্বেলে, শব্দ করে আমাকে আবারও সেটি ব্যবহার করতে ডাকতো।
পেশায় ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক মারিওস বলেন, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন তিনি। বর্তমানে ১২টি ব্যক্তিগত থেরাপি সেশনের মাধ্যমে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। তার বিশ্বাস, একাকীত্বই তাকে ফোনের প্রতি এতটা নির্ভরশীল করে তুলেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্টফোন আসক্তি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত মানসিক রোগ নয়। তবে ডেলয়েটের এক জরিপে দেখা গেছে, এক হাজার প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৭০ শতাংশই মনে করেন তারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় ফোন ব্যবহার করেন।
যুক্তরাজ্যের আসক্তি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ইউকেএটি জানিয়েছে, গত বছর তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা মাদকাসক্তদের প্রতি তিনজনের একজনের মধ্যে ফোন নির্ভরতার সমস্যাও ছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল প্রতি ১০ জনে মাত্র একজন।
চিকিৎসকদের মতে, ফোনে বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক বা নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আনন্দের অনুভূতির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে, যা ধীরে ধীরে আসক্তির রূপ নেয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জেমস নামে আরেক ব্যক্তি। চাকরি হারানোর পর তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদ ওয়েবসাইটে কাটাতেন। রাতের মধ্যেও ঘুম ভেঙে নিজের পোস্টে কতটি লাইক বা মন্তব্য এসেছে তা বারবার দেখতেন।
তিনি বলেন, ডিজিটাল দুনিয়া যেন আমাকে জিম্মি করে ফেলেছিল। ফোন ব্যবহার আর উপভোগ করতাম না, কিন্তু থামাতেও পারতাম না।
ডিজিটাল আসক্তি কাটাতে বিভিন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্রে ধাপে ধাপে স্ক্রিন টাইম কমানো, ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং এবং আসক্তির মূল কারণ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারনেট অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যাডিক্টস অ্যানোনিমাস নামের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগঠনও প্রযুক্তি আসক্তদের জন্য ১২ ধাপের পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
সংগঠনটির সদস্য জেনি জানান, একসময় তিনি টানা কয়েক দিন না ঘুমিয়ে অনলাইনে ভিডিও দেখতেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের সব ডিভাইস তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেছিলেন। বর্তমানে তিনি পাঁচ বছর ধরে স্ট্রিমিং বা বিনোদনমূলক ভিডিও দেখা থেকে বিরত রয়েছেন।
মনোচিকিৎসক হিল্ডা বার্কের পরামর্শ, নিজের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস বিশ্লেষণ করা জরুরি। তিনি বলেন, ফোন ধরার তাগিদ অনুভব করলে বিকল্প হিসেবে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, বই পড়া বা ব্যায়ামের মতো কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের জন্য নিজেকে দোষারোপ না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে।
এদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলিও এখন স্ক্রিন টাইম পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহারে সীমা নির্ধারণের মতো বিভিন্ন ফিচার যুক্ত করছে, যাতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
মারিওস বলেন, এখনও ফোন ব্যবহার করেন, কারণ স্প্যানিশ ভাষা শেখার মতো ইতিবাচক কাজেও এটি সহায়তা করে। তবে প্রতিদিনই তিনি ফোন কম ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
সূত্র: বিবিসি
এমএসএম








