ভারতে সোনা বন্ধক রেখে ঋণ (গোল্ড লোন) নেওয়ার প্রবণতা এখন আকাশচুম্বী। দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে সোনা জমা রেখে টাকা ধার করার এক অভূতপূর্ব হিড়িক দেখা দিয়েছে। মূলত বিশ্ববাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ক্রেডিট তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘এক্সপেরিয়ান ইন্ডিয়া’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে সোনার বন্ধকী ঋণের গড় পরিমাণ ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার রুপিতে। মাত্র তিন বছর আগে এই ঋণের গড় পরিমাণ ছিল ৯৮ হাজার রুপি। সেই হিসাবে মাত্র তিন বছরে ঋণের অংক দ্বিগুণ হয়েছে।
আরও পড়ুন
ধারণার চেয়েও কমে যেতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস
সোনার দাম ও ঋণ বৃদ্ধি
সোনার দাম বাড়ার কারণেই মূলত ঋণের পরিমাণ এত দ্রুত বাড়ছে। বিগত দুই বছরে সোনার মূল্যসূচক বেড়েছে ১৪৪ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে অনুমোদিত সোনার ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২০০ শতাংশ।
যেহেতু সোনার বাজারমূল্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তাই গ্রাহকেরা একই পরিমাণ সোনা জমা রেখে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। সম্পদ হাতবদল না করেই বেশি টাকা পাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না ভারতীয়রা।
দেশটিতে গত দুই বছরে সোনা বন্ধক রাখার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৬৯ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের সামগ্রিক সোনার ঋণের (Gold Loan) পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৩ লাখ কোটি রুপি। ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ তা এক লাফে বেড়ে ১৯ দশমিক ৪ লাখ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ও ভারতে সোনার দামে পার্থক্য কতটা?
বিপদের বন্ধু
ভারতে মোট খুচরা ঋণের বাজারেও সোনার ঋণের অংশ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ অর্থবছরে খুচরা ঋণে সোনার ঋণের অংশ ছিল ২০ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবছরে এসে ৪১ শতাংশে ঠেকেছে। জরুরি পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা ব্যবসার কাজে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা পাওয়ার জন্য মানুষ এখন সোনা বন্ধক রাখাকে বেছে নিচ্ছেন।
এক্সপেরিয়ান ইন্ডিয়ার কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মনিষ জৈন বলেন, ভারতের পরিবারগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ সোনা সঞ্চিত থাকে। সোনার ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি প্রভাতি সম্পদকে সহজে ব্যবহারযোগ্য অর্থায়নের উৎসে পরিণত করছে। এর ফলে একদিকে যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও জীবিকার নানাবিধ প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন?
দক্ষিণ ছাড়িয়ে পুরো ভারতে
আগে ভারতের কেবল দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সোনা বন্ধক রাখার প্রথা বেশি প্রচলিত ছিল। তবে এক্সপেরিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, এখন এই ঋণের পরিধি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলোতেও এর ব্যাপক জোয়ার দেখা যাচ্ছে।
বিগত অর্থবছরে উত্তর প্রদেশে ১৩৮ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ১১২ শতাংশ, রাজস্থানে ১০৫ শতাংশ এবং মহারাষ্ট্রে ১০২ শতাংশ সোনার ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে প্রথাগত অঞ্চলের বাইরে গিয়ে পুরো ভারতেই এখন সোনা বন্ধক রাখার সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন
দামে ১৩ বছরের সবচেয়ে বড় পতন, সোনা কেনার এখনই কি সেরা সময়?
বারবার ঋণ নেওয়ার প্রবণতা
সোনার ঋণকে মানুষ এখন আর জীবনের শেষ ভরসা হিসেবে দেখছে না। এটি এখন একটি নিয়মিত আর্থিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহকই ছিলেন পুরোনো ঋণগ্রহীতা, যারা আবার নতুন করে ঋণ নিয়েছেন।
এর পাশাপাশি ঋণের মেয়াদের ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন এসেছে। গ্রাহকেরা এখন দীর্ঘ মেয়াদের চেয়ে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ নিতে বেশি পছন্দ করছেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদ সবচেয়ে কম দেখা গেছে।
সূত্র: মিন্ট
কেএএ/








