আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে আইন (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধনে সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত, দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত সুপারিশ করবে ইসি।
এ ছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রতি ১৫ বছর পরে নবায়ন করার সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। নবায়নের সময় আবেদনকারীকে ফ্রি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের তথ্য দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ইসি প্রত্যেক নাগরিকের ফ্যামিলি ট্রি বা বংশগত তথ্য তৈরি করতে পারে। ১৫ বছরেরও কম বয়সীদেরও এনআইডি প্রদানের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। তবে, এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়সসীমা পরে নির্ধারণ করা হবে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে কমিশনের ১২ তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সকাল ১১টায় সভা শুরু হয়ে দুপুর ২টায় এক ঘণ্টার মুলতবি করে বিকেল সাড়ে ৫টার পরে শেষ হয়।
সভায় ২০০৯ সালে করা স্থানীয় সরকারের পাঁচটি আইন তথা—সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনের পর্যালোচনা করা হয়।
আখতার আহমেদ বলেন, এই আইনগুলোর ভেতরে আমাদের কমিশনের বিবেচনায় যে সমস্ত জায়গায় সংশোধন করা দরকার, আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।
সবগুলো আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করার সুপারিশ করেছি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে সবগুলোর আইনে এটা (সশস্ত্র বাহিনী) যুক্ত করা উচিত।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ সুযোগ বাতিলের সুপারিশ সরকারের কাছে করতে যাচ্ছে ইসি।
আখতার আহমেদ বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি পারবেন না—এ বিষয়ে কমিশন মনে করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হয়।
ঋণ খেলাপির বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, এখানে দুটো ক্ষেত্র একটা হচ্ছে বন্ধকদাতা এবং জামিনদার। ব্যক্তিগতভাবে বন্ধকদাতা তিনি তো আছেনই, কিন্তু জামিনদারদেরও ঋণ খেলাপি হিসেবে অযোগ্য করার একটা প্রস্তাবনায় আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি।
এর পাশাপাশি বিল খেলাপি—বিদ্যুৎ বিল, ভূমি কর, ওয়াসা এ ধরনের যে সমস্ত সেবা প্রদানকারী সংস্থায় যদি কোনো বিল খেলাপি থাকে, সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে। এটা অযোগ্যতা হিসেবে আসবে। লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করা যাবে না।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চার্জশিটভুক্তদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে ইসি। দ্বৈত নাগরিকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে ইসি। বিষয়টি নিয়ে সচিব বলেন, কমিশন মনে করে তাদেরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, এ বিষয়ে সংবিধানে বাধা আছে (জাতীয় নির্বাচনের কথা বলা আছে সংবিধানে)।
পাশাপাশি আচরণ বিধিমালাগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আইন সংশোধনের বিষয়গুলো আমরা এখন স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠাব, তারা উপযুক্ত মনে করলে ব্যবস্থা নেবেন। এ প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগে দ্রুতই পাঠানো হবে বলে জানান ইসি সচিব।
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আমরা চূড়ান্ত (আইন) করার এখতিয়ার রাখি না, আমরা আইনের কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ করছি। চূড়ান্ত করার দায়িত্ব তো স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংসদ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল কবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিডিউল চূড়ান্ত হলে জানাব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের টাইমলাইনের বিষয়ে বলেন, প্রস্তুতির ব্যাপারটা চলমান। আমরা বলেছি ৩১শে জুলাই পর্যন্ত যারা ভোটার নিবন্ধিত হবেন তাদের নিয়ে আমাদের কাজ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মহোদয় বলেছিলেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, তো সেই অনুযায়ী আমাদের ড্রাফট রেডি করে কাজ করতে হবে।
আইন সংশোধনীর কারণে ভোট পেছানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটাতো আমি বলতে পারব না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশন তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে আমরা যত দ্রুত দিতে পারব (সুপারিশ)। তত দ্রুত আরেকটা কাজ আগাতে পারব।
আইন সংশোধনের কাজ তো স্থানীয় সরকার বিভাগের, সে দায়িত্ব ইসি কেন নিচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, ইসির কি সুপারিশ করা বা প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি নেই? যদি বলে প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার নেই, তাহলে একভাবে। আবার মনে করে পর্যালোচনা করার জন্য সুপারিশ। সুপারিশ যে রাখতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা মনে করেছি সুপারিশ করা যায়। সে জন্য সুপারিশ পাঠাব। রাখা বা না রাখা যার এখতিয়ার, তিনি করবে।
এতে সরকার চাপে পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসির সচিব বলেন, সরকার চাপে পড়বে কি না সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবেন।
কমিশন সভায় এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ভোটার স্থানান্তরে নিয়ে কথা হয়েছে উল্লেখ করে আখতার আহমেদ বলেন, ভোটার এলাকা স্থানান্তর অনলাইনে আবেদন করা যাবে। স্থানান্তরের একটা সংশোধনী ফি দিতে হবে, এটা নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে প্রতি ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়নের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কমিশন সভায় কথা হয়েছে উল্লেখ করে ইসি সচিব বলেন, এনআইডি নবায়নের জন্য নির্ধারিত একটা ফরম থাকবে এবং সেই ফরমে কী কী তথ্য থাকবে—একটা ফ্যামিলি ট্রির কথা বলা হয়েছে, আবেদনকারী বা এনআইডিধারী তার পরিবারের তথ্যটা দেবেন যাতে সংগতিটা আমরা মেনটেইন করতে পারি। এ ক্ষেত্রেও একটা ন্যূনতম ফি-র ব্যাপার আছে।
বর্তমানে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের এনআইডির জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যাতে ১৮ বছর হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে যান। আখতার আহমেদ বলেন, এ তথ্য সংগ্রহের পর্যায়টা কোন পর্যন্ত নামানো যায়, সেটা নিয়ে আরও কিছু পর্যালোচনার পরে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটা এসএসসি নাকি ক্লাস এইট নাকি প্রাইমারি এনরোলমেন্ট—যেটাই হোক না কেন, একটা তুলনামূলক বিবরণী অনুযায়ী পরবর্তীতে সিদ্ধান্তে আসব।
বর্তমানে এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধন কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে কমিশন বিকল্প ভাবছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, এখন পাবলিক পরীক্ষার সনদের (এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি) জন্মতারিখের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে এই সংশোধনগুলো করতে পারবে। সেই ব্যবস্থা করা হবে।
প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের ব্যাপারে এটা টু-স্টেপ মেকানিজম ছিল। প্রবাসীরা ফরম জমা দেওয়ার পর বায়োমেট্রিক দেওয়ার পরে আমাদের এখানে তদন্তে আসত, তদন্ত পারফর্ম হওয়ার পরে সেটা আপলোড হতো। এখন বায়োমেট্রিকটা আপলোড করে দেবেন, আমরা এখানে তদন্তে যথার্থতা পেলে এখান থেকেই অনুমোদন দিয়ে দেব। এতে একটা স্টেপ কমে যাবে।







