মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের কাছে অং সান সু চির এখনো জীবিত থাকার প্রমাণ চেয়েছেন তাঁর ছেলে কিম অ্যারিস। তিনি বলেন, সু চিকে যে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয়েছে, এমন দাবির পক্ষে তাঁর পরিবার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পায়নি।

কিম অ্যারিস মিয়ানমারের বন্দী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রীর ছোট ছেলে। গত এপ্রিলে জান্তা সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ৮১ বছর বয়সী সু চির কারাদণ্ড কমিয়ে প্রায় ১৭ বছর করা হয়েছে এবং তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়েছে। তবে অ্যারিস জানিয়েছেন, এই ঘোষণার বিষয়ে তাঁর মনে এখনো গভীর সন্দেহ রয়েছে।

বরং কিম মনে করেন, নোবেলজয়ী মাকে এখনো নেপিডোর কারাগারেই আটকে রাখা হয়েছে।

লন্ডন থেকে সংবাদমাধ্যম কিয়োদো নিউজকে সু চির ছেলে বলেন, ‘মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা শুধু একটাই খবর শুনতে পাই, আর তা হলো তাঁর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।’

কিম আরও বলেন, যে কারাগারে তাঁর মাকে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, সেখানকার পরিবেশ ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’। ওই কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক সাবেক বন্দীর কাছ থেকে তিনি এই তথ্য জেনেছেন।

কিম বলেন, তাঁর মা হৃদ্‌রোগে ভুগছেন। সেই সঙ্গে বয়সজনিত বিভিন্ন সমস্যা, যেমন অস্টিওপোরোসিস (হাড়ক্ষয়) রোগেও তিনি আক্রান্ত। তিনি আরও জানান, দুই বছরের বেশি সময় আগে মায়ের পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমেই শেষবারের মতো তাঁদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছিল।

১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতেন সু চি। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং তাঁকে বন্দী করে। তখন দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ছিল এবং সু চি ছিলেন সেই সরকারের কার্যত প্রধান। এর পর থেকে বিভিন্ন মামলায় তাঁর বিচার ও সাজা হয়েছে। তবে তাঁর সমর্থক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলেছেন, এসব বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মিয়ানমারের সামরিক সরকার এই বছরের শুরুতে দাবি করেছিল, সু চিকে (জেল থেকে) সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয়েছে। তবে কিম অ্যারিস বলেছেন, সত্যিই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তার ‘কোনো প্রমাণ’ নেই।

৪৮ বছর বয়সী কিম অ্যারিসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। তাঁর বয়স যখন ১১ বছর, তখন তাঁর মা (সু চি) নিজের অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করতে মিয়ানমারে ফিরে যান। এর আগপর্যন্ত কিম তাঁর বাবা–মা দুজনের সঙ্গেই থাকতেন। মিয়ানমারে যাওয়ার মাধ্যমেই সু চি দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সময় ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর সু চিকে গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাজ্যে কিম অ্যারিসকে বড় করেন তাঁর বাবা প্রয়াত ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ মাইকেল অ্যারিস।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কিম অ্যারিস বুঝতে পারেন, মায়ের পক্ষে কথা বলার জন্য এখন তাঁকেই জনসমক্ষে আসতে হবে।

অং সান সু চি

কিম বলেন, ‘আমি পরিচিত ব্যক্তিত্ব হতে চাইনি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মায়ের জন্য আমাকে রুখে দাঁড়াতেই হতো।’

গত জুনে ছিল সু চির ৮১তম জন্মদিন। মাকে যে এখনো বন্দী করে রাখা হয়েছে, সেদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিম অ্যারিস স্কেটবোর্ডে ৮১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার একটি চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করেন।

এর আগে তিনি ‘এইটি ওয়ান ফর এইটি ওয়ান’ নামে আরেকটি প্রচারও চালিয়েছিলেন। ওই প্রচারে তিনি সারা বিশ্বের সমর্থকদের ৮১ সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কাজ করার উৎসাহ দেন। একই সঙ্গে তাঁর মা বেঁচে আছেন কি না, তার স্বাধীন প্রমাণ দিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতিও আহ্বান জানান।

মায়ের মুক্তির দাবিতে প্রচার চালাতে কিম অ্যারিস জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের ওপর চাপ বজায় রাখতে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

জান্তা ও গণতন্ত্রকামী বাহিনীর মধ্যে এখনো লড়াই চলছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর কাছে বিমানের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, এটি করতে পারলে সাধারণ মানুষের ওপর বিমান হামলা কমানো যাবে।

সু চির ছেলে বলেন, ‘সেনাবাহিনী যেন কোনোভাবেই বিমানের জ্বালানি না পায়, সেটা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’

১৯৮৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সু চি তাঁর জীবনের মোট ২০ বছরই হয় কারাগারে, নয়তো গৃহবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছেন।

গত পাঁচ বছর ছিল সু চির জন্য সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর সময়। এই সময়ে তাঁকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে, তা তাঁর পরিবারও নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি।