সুরা বাকারা পবিত্র কোরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ সুরা। রাসুলুল্লাহর (সা.) বহু হাদিসে এই সুরার বিশেষ মাহাত্ম ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। সুরা বাকারা কোরআনের দীর্ঘতম সুরা, আয়াত সংখ্যা ২৮৬, রুকু বা পরিচ্ছেদ সংখ্যা ৪০। মুফাসসিরগণের মতে এই সুরায় এক হাজার সংবাদ, এক হাজার আদেশ এবং এক হাজার নিষেধের সমাবেশ ঘটেছে। 

এখানে আমরা সুরা বাকারার কিছু বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত সংক্ষেপে তুলে ধরেছি:

কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত সুরা বাকারায়

সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতটি ‘আয়াতুল কুরসী’ নামে পরিচিত, যা কোরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত। এ আয়াতে মহান আল্লাহর তাওহিদ, ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের এক অনবদ্য বিবরণ রয়েছে।

উবাই ইবনে কা’ব থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসুল (সা.) এ আয়াতটিকে কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত বলেছেন। (সহিহ মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজ শেষে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না। (সুনানে নাসাঈ)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাতে শয্যা গ্রহণের সময় আয়াতুল কুরসী পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা সারারাত পাঠকারীকে পাহারা দেন এবং সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তার নিকটবর্তী হতে পারে না (সহিহ বুখারি)।

শয়তানের উপদ্রব থেকে ঘরের সুরক্ষা দেয় সুরা বাকারা

নিয়মিত সুরা বাকারা তিলাওয়াত করলে ঘর শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না, নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়। (সহিহ মুসলিম)

অন্য এক হাদিসে এসেছে, যে ঘরে পর পর তিন রাত সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত পাঠ করা হয়, শয়তান সেই ঘরের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। (সুনানে তিরমিজি)

কোরআনের সুউচ্চ চূড়া

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, প্রত্যেক জিনিসের একটি চূড়া থাকে, কোরআনের চূড়া হলো সুরা বাকারা।

অর্থাৎ সুরা বাকারা যেমন কোরআনের দীর্ঘতম সুরা, এই সুরায় জীবনঘনিষ্ঠ বিধিবিধান সবচেয়ে বেশি, দোয়া ও উপদেশও অনেক, তাই সুরাটি যেন কোরআনের সুউচ্চ শিখর বা চূড়া।

সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের অনন্য ফজিলত

সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত মুমিনের জন্য এক অনন্য উপহার। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত পাঠ করবে, তা তার জীবনের সব বিপদের জন্য যথেষ্ট হবে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

অর্থাৎ এই দুই আয়াতের তিলাওয়াত তাকে রাতের যাবতীয় মন্দ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে, শয়তানের ক্ষতি থেকেও বাঁচাবে।

বরকতের দরজা ও জাদু প্রতিরোধকারী

সুরা বাকারা তিলাওয়াত করলে জীবনে অভাবনীয় বরকত আসে, রিজিক বৃদ্ধি পায়। কুফরি কালাম, বদনজর ও জাদুর প্রভাব দূরে সরে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সুরা বাকারা শিক্ষা করো। কারণ এটি গ্রহণ করার মাঝে রয়েছে বরকত এবং বর্জন করার মাঝে রয়েছে অনুতাপ। কোনো বাতিলপন্থী বা জাদুকর এর মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে না। (সহিহ মুসলিম)

চমৎকার দোয়াসমূহ

সুরা বাকারার বিভিন্ন আয়াতে এমন কিছু অর্থবহ ও হৃদয়স্পর্শী দোয়া রয়েছে, যা মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা উচিত। এখানে আমরা ৪টি দোয়া উল্লেখ করছি:

 سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

উচ্চারণ: সুবহানাকা লা ইলমা লানা ইল্লা মা আল্লামতানা, ইন্নাকা আন্তাল আলীমুল হাকীম।

অর্থ: পবিত্র তোমার সত্তা! তুমি আমাদের যা শিখিয়েছ, তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই তুমি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা বাকারা: ৩২)

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: রব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আন্তাস সামী‘উল ‘আলীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করো; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা বাকারা: ১২৭)

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুন্‌ইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আযাবান নার।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো। (সুরা বাকারা: ২০১)

 رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: রব্বানা আফরিগ ‘আলাইনা সবরাওঁ ওয়া সাব্বিত আক্বদামানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বওমিল কাফিরীন।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দাও, আমাদের কদম সুদৃঢ় রাখো এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো। (সুরা বাকারা: ২৫০)

ওএফএফ