প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের অন্যতম প্রধান যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী টাটা ইলেকট্রনিক্স বড় ধরনের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৬৩০ গিগাবাইটেরও বেশি গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে সেগুলোর একটি অংশ ইন্টারনেটে প্রকাশ করেছে। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে আগামী সেপ্টেম্বরে বাজারে আসার সম্ভাবনা থাকা আইফোন ১৮ প্রো মডেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ছবি এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা।
টাটা ইলেকট্রনিক্স বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে। অ্যাপল ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। জানা গেছে, ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ নামের একটি কুখ্যাত সাইবার অপরাধী চক্র এই হামলার সঙ্গে জড়িত। এই ঘটনার ফলে অ্যাপলের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বহু গোপন তথ্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে অ্যাপল এবং ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
গত ১২ জুন ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ তাদের গোপন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হামলার দায় স্বীকার করে। তারা দাবি করেছে, দুই লাখেরও বেশি নথি ও তথ্যভান্ডার তাদের দখলে রয়েছে এবং এর একটি অংশ প্রকাশ করা হয়েছে। টাটা ইলেকট্রনিক্সও সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে আইফোন ১৮ প্রোর মূল বর্তনী ফলক, চিপ, ব্যাটারির বিভিন্ন অংশ এবং ক্যামেরা ব্যবস্থার বিস্তারিত নকশা ও তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি কোন প্রতিষ্ঠান কোন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ও নকল পণ্য প্রস্তুতকারকেরা অনৈতিক সুবিধা লাভ করতে পারে।
টাটা ইলেকট্রনিক্স জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করেছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তদন্ত চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সাইবার হামলা সাধারণত দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। হামলাকারীরা অনেক সময় মাসের পর মাস কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করে গোপনে অবস্থান করে এবং সুযোগ বুঝে বিপুল পরিমাণ তথ্য চুরি করে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তি নির্ভর করে তার সবচেয়ে দুর্বল অংশের ওপর। এ ক্ষেত্রে অ্যাপলের নিজস্ব ব্যবস্থা আক্রান্ত না হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে চলে এসেছে।
‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ মূলত তথ্য চুরি করে অর্থ আদায়ের কৌশলে কাজ করে। তারা বড় প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য দখলে নিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করে। দাবি পূরণ না হলে সেই তথ্য প্রকাশ করে দেয়।
এর আগেও এই চক্র একাধিক বড় প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরির অভিযোগে আলোচনায় আসে। গত বছরের জুলাই মাসে তারা ডেলের বিপুল পরিমাণ তথ্য চুরির দাবি করেছিল। চলতি বছরের শুরুতে নাইকির তথ্যভান্ডারে অনুপ্রবেশের দাবিও তারা করে।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় সাধারণ গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য বা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো তথ্য ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চুরি হওয়া তথ্যের বেশিরভাগই ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার ফলে অ্যাপল ও টাটা ইলেকট্রনিক্স—উভয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি চীন থেকে উৎপাদন কার্যক্রম ধীরে ধীরে ভারতে স্থানান্তরের যে পরিকল্পনা চলছিল, তাতেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। কারণ অ্যাপল তার পণ্যের নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করে।
বর্তমানে বিশ্বের মোট আইফোন উৎপাদনের একটি বড় অংশ ভারতে সম্পন্ন হচ্ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে উৎপাদিত প্রতি চারটি আইফোনের মধ্যে একটি ভারতে সংযোজিত হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে, ওই বছর প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ আইফোন ভারতে তৈরি হয়েছে। অথচ মাত্র চার বছর আগে এই হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।
The post টাটা ইলেকট্রনিক্সে সাইবার হামলা, ফাঁস আইফোন ১৮ প্রোর গোপন তথ্য appeared first on ZoomBangla.






