ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে, খাবারও খাচ্ছেন নিয়মিত। তবুও হঠাৎ ওজন বেড়ে যাচ্ছে বা কমে যাচ্ছে, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে, চুল পড়ছে বা অকারণে মন খারাপ থাকছে-এগুলোকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু এসব লক্ষণের পেছনে থাকতে পারে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ থাইরয়েডজনিত রোগে আক্রান্ত। নারীদের মধ্যে এ সমস্যা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। তবে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত হলে ও নিয়মিত চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

আরও পড়ুন

বর্ষায় অ্যাজমা রোগীদের যা মানা জরুরি

থাইরয়েড কী?

থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতির আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি। এটি থাইরক্সিন এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে। এই হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদ্‌স্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা, শক্তি উৎপাদন এবং বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

থাইরয়েড হরমোন খুব কম বা খুব বেশি উৎপন্ন হলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েড সমস্যার ধরন

হাইপোথাইরয়েডিজম: থাইরয়েড হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে কম উৎপন্ন হয়।
হাইপারথাইরয়েডিজম: থাইরয়েড হরমোন অতিরিক্ত উৎপন্ন হয়।

দুই ধরনের সমস্যার উপসর্গ একেবারে ভিন্ন হতে পারে।

আরও পড়ুন

টানা বৃষ্টিতে সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে যা করবেন

হাইপোথাইরয়েডিজমের সাধারণ উপসর্গ

  • সব সময় ক্লান্ত লাগা
  • অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়া
  • ঠান্ডা বেশি লাগা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • চুল পড়া বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
  • মুখ ও শরীরে ফোলাভাব
  • মনোযোগ কমে যাওয়া
  • স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া
  • বিষণ্নতা বা মন খারাপ
  • হৃদ্‌স্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়া
  • নারীদের অনিয়মিত বা অতিরিক্ত মাসিক
আরও পড়ুন

খালি পেটে অলিভ অয়েল খাওয়ার আগে সতর্ক হোন

হাইপারথাইরয়েডিজমের সাধারণ উপসর্গ

  • দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • গরম সহ্য করতে না পারা
  • হাত কাঁপা
  • অস্থিরতা বা উদ্বেগ
  • ঘুমের সমস্যা
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া
  • ঘন ঘন পায়খানা হওয়া
  • পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • কিছু ক্ষেত্রে চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেরিয়ে আসা (বিশেষত গ্রেভস ডিজিজে)
আরও পড়ুন

সিঁড়ি ভাঙলেই ক্লান্ত? কারণটা শুধু অলসতা নয়

যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়

  • অকারণে ওজনের বড় পরিবর্তন
  • দীর্ঘদিন ক্লান্তি
  • হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন
  • গলায় ফোলা বা গিঁট অনুভব হওয়া
  • দীর্ঘদিন চুল পড়া
  • মাসিক চক্রে পরিবর্তন
  • সন্তান ধারণে সমস্যা
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে থাইরয়েড রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যেমন- নারী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলে, অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর কিছু নারী, আগে ঘাড়ে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া ব্যক্তি।

আরও পড়ুন

শিশুর ডায়রিয়া এড়াতে বর্ষায় বাদ দিন এই খাবার

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

শুধু উপসর্গ দেখে থাইরয়েড রোগ নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করতে পারেন, যেমন- টিএসএইচ, ফ্রিটি৪, ফ্রিটি৩, থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ও প্রয়োজনে থাইরয়েড আলট্রাসনোগ্রাম।

চিকিৎসা কী?

থাইরয়েডের চিকিৎসা রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমে সাধারণত থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপনের ওষুধ (যেমন লেভোথাইরক্সিন) ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমে ওষুধ, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি বা বিশেষ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

আরও পড়ুন

জলাবদ্ধ পানিতে হাঁটলেন? বাসায় ফিরেই করুন এই কাজ

থাইরয়েড ভালো রাখতে কী করবেন?

  • সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
  • প্রয়োজনীয় পরিমাণ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন।
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ করুন।
  • নিজের ইচ্ছামতো থাইরয়েডের ওষুধ বন্ধ করবেন না।

থাইরয়েডের সমস্যা অনেক সময় নীরবে শুরু হয় এবং সাধারণ ক্লান্তি বা মানসিক চাপের সঙ্গে মিল থাকায় সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। তাই দীর্ঘদিন ধরে অকারণে ওজনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত ক্লান্তি, চুল পড়া, হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা বা গলায় ফোলা দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব।

আরও পড়ুন

বৃষ্টির দিনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা খাবেন

তথ্যসূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনএইচএস

জেএস/