প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় একটি প্রকল্পের সাবেক পরিচালকের (পিডি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন মন্ত্রীর আত্মীয়ের বন্ধু হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি নানা অপকর্ম করতেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তার বনিবনা হতো না, তাদের ধরে পেটানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওই প্রকল্পটির নাম ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ জোরদারকরণ প্রকল্প। তদন্তসূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পের কাজের ৪৫ লাখ টাকার বিল ঠিকাদারকে না দিয়ে পিডি মো. আজিজুল ইসলাম আত্মসাৎ করেছেন।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ঠিকাদার মো. ইয়াছির আরাফাত ইউসুফের দাবি, পিডি নিজেই বিল তুলে আত্মসাৎ করেছেন। তার অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে বিধিবহির্ভূতভাবে ভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সবাই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তার এই দাবি তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে।

জানা যায়, প্রথম ঠিকাদারের অভিযোগ তদন্তে একজন যুগ্মসচিবকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেআইনি সব কাজের জন্য সাবেক পিডি আজিজুল ইসলামকে দায়ী করা হয়। তদন্তে প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ অবান্তর, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যমূলক বলেও প্রমাণিত হয়েছে। তবে অদৃশ্য কারণে এখনো তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্স কোনো বিলও পায়নি।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) ও তদন্ত কমিটির সদস্য শাহ জামাল খান তুহিন যুগান্তরকে বলেন, ২০২২ সালের শেষের দিকে তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তদন্ত করে দেখেছি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যায় করেছেন প্রকল্প পরিচালক। প্রথম ঠিকাদার ও দ্বিতীয় ঠিকাদার নিয়োগের মধ্যে রয়েছে পিডির কারসাজি। নানা মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে প্রথম ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। পিডি অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশে ঠিকাদারের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

প্রকল্পটির দ্বিতীয় পিডি মো. মকবুল হোসেন জানান, প্রায় তিন বছর আগের ঘটনা। বিষয়গুলোর সঙ্গে সাবেক পিডি আজিজুল ইসলাম জড়িত। তিনি বিগত সরকারের সময় খুব প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি মারামারির একটি মামলায় বর্তমানে বরখাস্ত আছেন।

মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় প্রভাব খাটাতেন আজিজুল : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, পিডি আজিজুল ইসলাম সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের বোনজামাই বেলাল হোসেনের বন্ধু। অধিদপ্তরের ডিজি বা পরিচালক কাউকে তিনি পাত্তা দিতেন না। এমনকি দরজা বন্ধ করে একাধিক কর্মকর্তাকে নির্যাতন করেছেন। সম্মান হারানোর ভয়ে অনেকে তা প্রকাশ করেননি। একবার সাবেক মন্ত্রী মো. আবদুর রহমানের বাসার লিফটে একজন পরিচালককে পিটিয়েছিলেন আজিজুল। সাবেক কৃষিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তিনি এসব করতেন।

কী ছিল তদন্ত প্রতিবেদনে : ওই প্রকল্পের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্সের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন। ২০২৩ সালের ৬ জুন ৩৯ লাখ ৯১ হাজার ১০৮ টাকা এবং ২৬ লাখ ৭৮ হাজার ১১৩ টাকা ঠিকাদারকে প্রদানের কথা জানান। অথচ এ দাবির সত্যতা নেই। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পরের বছর কাশবন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রিভাইস কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্টের দাবি করেন সাবেক পিডি আজিজুল। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক তদন্ত কমিটিকে জানান, রিভাইস কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্টে যে স্বাক্ষর আছে, তা কাশবন এন্টারপ্রাইজের নয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এফ ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেওয়ার এক মাসের মাথায় বিল পরিশোধের চেক ইস্যু করে তা হস্তান্তর না করে নিজের আয়ত্তে রাখেন, যা ঠিক হয়নি। পক্ষান্তরে প্রচার করেছেন তিনি বিল পরিশোধ করেছেন।

যা বললেন অভিযুক্ত পিডি : প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, এসব বানোয়াট অভিযোগ। তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়েছেন। এছাড়া তদন্ত কমিটির সভাপতি যুগ্মসচিব শাহিনা ফেরদৌস সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের আত্মীয়। এফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডার্সের মালিকের সঙ্গে তদন্ত কমিটির সভাপতির সুসম্পর্ক রয়েছে।