লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নিহত মা ও তার তিন মেয়ের লাশ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার স্থানীয় কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার রাত প্রায় ১০টায় জানাজা শেষে পৌরসভার লটিয়া গ্রামে সামাজিক কবরস্থানে তাদের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে তাদের লাশ গ্রামে পৌঁছলে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শেষবারের মতো তাদের দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ভিড় করেন। মানুষের মুখে ছিল একটাই প্রশ্ন-নিষ্পাপ শিশুদের অপরাধ কী ছিল?
পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান জুনায়েদ হোসেন সিফাতের কান্না উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয়। সে বিলাপ করে বলছিল, ‘এখন আমাকে কে দেখবে? ৭ বছর আগে বাবাকে হারিয়েছি। মা আর বোনদের নিয়েই বাঁচার স্বপ্ন ছিল। আজ সবাই চলে গেল।’
লটিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। একই পরিবারের মা ও তিন মেয়ে খুন হওয়ার খবর শোনার পর থেকে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। আশপাশের ১০ গ্রামের লোকজন এসে খোঁজখবর নিয়েছেন।’ নিহত শাহিনুরের দেবর জামাল হোসেন বলেন, সিফাতের লেখাপড়া নিয়ে চিন্তায় আছি।’
রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), নাফিসা আক্তার ইকরা বেগম (১৭) ও ফাতেমা আক্তার শিফা (৯)। তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। গত ২৫-২৬ বছর ধরে তারা রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
দুই মামলা ও তদন্ত কমিটি : লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। পরিবারটির একমাত্র সদস্য জিহাদুল ইসলাম শিফাত অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে। অন্যদিকে খুনি অন্তর মজুমদারকে গণপিটুনির হাত থেকে উদ্ধার করার সময় সাত পুলিশ সদস্য ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। এসআই আমিনুল ইসলামের করা এই মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। এ দুটি হত্যা মামলাই তদন্ত করছেন রায়পুর থানার ওসি (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান।
খুনি অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাটের বাসিন্দা। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, সে রায়পুরে ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসাবে কাজ করত। শুক্রবার দুপুরে তার লাশ পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে যায় স্বজনরা। হত্যার প্রতিবাদ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রছাত্রী কল্যাণ সমিতি।
প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন হয়নি : একা এক ব্যক্তি বাসায় ঢুকে এক পরিবারের চারজনকে কেন হত্যা করল, এই প্রশ্নের জবাব মেলেনি এখনো। শনিবার সকালে স্থানীয় এমপি আবুল খায়ের ভূঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রকৃত খুনি কে তা তদন্ত করে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতেও চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশের ডিআইজি মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ, সিআইডি ও র্যাব তদন্ত চালাচ্ছে।
রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা আলামত হিসাবে জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। শুক্রবার দুপুরে মা, তিন মেয়েকে ছেলে সিফাতসহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে অন্তরের পরিবার তার লাশ গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাই লাশ নিয়ে যান।


