ইউরোপজুড়ে টানা কয়েক সপ্তাহের তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে চীনের গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি নির্মাতা কোম্পানি মিডিয়ার একটি পোর্টেবল এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে। গ্রীষ্মের মৌসুমে ইউরোপের সবচেয়ে দুর্লভ পণ্যগুলোর একটিতে পরিণত হওয়া এই এসি বাজারে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একাধিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রি শেষ হয়ে গেছে।

হংকং থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, মিডিয়ার পোর্টাস্প্লিট (PortaSplit) নামের এই পোর্টেবল এসির চাহিদা বেড়েছে এমন সময়ে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে এই পণ্যের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর নকশা। বহু ইউরোপীয় শহরে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ভবনের বাইরের দেয়ালে ড্রিল করে প্রচলিত স্প্লিট-সিস্টেম এসির বাহ্যিক ইউনিট বসানো কঠিন। পোর্টাস্প্লিটে স্থায়ী ইনস্টলেশন বা দেয়ালে ছিদ্র করার প্রয়োজন হয় না। একটি বিশেষ জানালার ব্র্যাকেট ব্যবহার করে ভবনের বাইরে ইউনিটটি ঝুলিয়ে রাখা যায়, ফলে অনেক নিয়ন্ত্রক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এড়ানো সম্ভব হয়।

ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের সেরে শহরের বাসিন্দা ক্রিস্টোফার ডি ব্রুইন জানান, ২০২৪ সালে নিজের বাড়িতে তিনটি এয়ার কন্ডিশনার বসানোর অভিজ্ঞতা ছিল ‘বেশ কষ্টকর।’ তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় এক ইনস্টলার প্রথমে প্রায় ৮ হাজার ইউরো (প্রায় ৯ হাজার ১৬০ মার্কিন ডলার) ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ডেলিভারি ও ইনস্টলেশনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কথাও জানানো হয়। আগে স্পেনে বসবাস করায় তিনি সেখানে গিয়ে একই ধরনের মডেলের দাম যাচাই করেন এবং দেখেন, সেগুলোর মূল্য ছিল প্রায় অর্ধেক। তাঁর অভিযোগ, ফ্রান্সের ইনস্টলাররা কার্যত দ্বিগুণ অর্থ নিয়ে থাকেন।

তবে বিদেশ থেকে কম দামে যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ থাকলেও তিনি তা কাজে লাগাতে পারেননি। কারণ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, ফ্রান্সের অধিকাংশ ইনস্টলার বিদেশ থেকে কেনা যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে রাজি হন না। শেষ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের একটি গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির দোকান থেকে প্রায় ৪ হাজার ইউরো ব্যয়ে এসিগুলো কেনেন। কিন্তু বাধ্যতামূলক সাইট পরিদর্শন এবং দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকার কারণে মে মাসে মূল্য পরিশোধের পরও সেগুলো সেপ্টেম্বরের আগে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘ফলে পুরো গ্রীষ্মটাই মিস করেছি।’

তিনি আরও জানান, ইউরোপের অধিকাংশ অ্যাপার্টমেন্টে এয়ার কন্ডিশনার স্থাপনের আগে বাড়ির মালিকদের সমিতির অনুমোদন নিতে হয়। তবে তিনি ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক হওয়ায় তুলনামূলক সহজেই অনুমতি ছাড়াই কাজটি সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।

তবে গত বছর প্রায় ৯০০ ইউরো দামে বিক্রি হওয়া পোর্টাস্প্লিট এখন দ্বিতীয় হাতের বাজারে কয়েক হাজার ইউরো দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে এর সরকারি খুচরা মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৯ ইউরো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, এই এসি কিনতে তাঁদের একাধিক শহরে গাড়ি চালিয়ে ঘুরতে হয়েছে। একজন লিখেছেন, ‘এটাই হবে আপনার জীবনের সেরা বিনিয়োগ।’ আরেকজনের মন্তব্য, ‘পোকেমন কার্ডের চেয়েও বিরল, একেবারে নতুন ও না খোলা মিডিয়া পোর্টাস্প্লিট আমার কাছে স্টকে আছে।’

পণ্যের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে মিডিয়াফাইন্ডার নামে একটি ওয়েবসাইট রিয়েল-টাইমে এই ইউনিটের স্টক পর্যবেক্ষণের সুবিধা দিচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে ইউরোপের আবাসন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে আক্রান্ত জার্মানিতে এই হার অর্ধেকেরও বেশি। পোর্টেবল এসি সহজেই এক বাসা থেকে অন্য বাসায় নিয়ে যাওয়া যায়, যা ভাড়াটিয়াদের কাছে এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারী নিজেই সহজে স্থাপন করতে পারেন এমন পোর্টাস্প্লিটের নকশা স্থানীয় অনেক নিয়ন্ত্রক ও ভবনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা কার্যত দূর করেছে। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থাও দ্রুত সক্রিয় হয়েছে। দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান এখন বিশেষ ‘এসি এয়ার লেন’ সেবার প্রচার করছে। এর মাধ্যমে দ্রুত বিমান পরিবহনে ইউরোপে এয়ার কন্ডিশনার পাঠানো হচ্ছে।

শেনজেনভিত্তিক এক লজিস্টিকস অপারেটর জানান, দুই সপ্তাহ আগে সেবাটি চালুর পর ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্য থেকে অর্ডারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমার গুদাম এয়ার কন্ডিশনারে ভরে গেছে। মনে হচ্ছে বিদেশে থাকা চীনা শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত গরমে নাজেহাল হয়ে পড়েছে।’

ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপের আবহাওয়া তুলনামূলক নাতিশীতোষ্ণ হওয়ায় ভবন নির্মাণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তাপ সংরক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শীতকালে জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর পুরু ও বায়ুরোধী ভবনগুলো চরম গরমের সময় ভেতরে তাপ আটকে রাখে। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ ভবন ২০০০ সালের আগে নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের বেশিরভাগই গ্রীষ্মে শীতল রাখার পরিবর্তে শীতপ্রধান আবহাওয়ায় উষ্ণতা ধরে রাখার উপযোগী করে নকশা করা হয়েছিল।