পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে অভিযোগ এনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধ টানা ৪০ দিন চলে। এরপর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে সংকট দেখা দেয়।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ট্রাম্পের এই ব্যর্থতায় ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েনও তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান নিয়ে আপত্তি তোলে সৌদি আরব। মোহাম্মদ বিন সালমানের আপত্তির মুখে অভিযান শুরুর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যায়।

অভিযানের প্রথম দিনেই সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল রিয়াদ।

এ ঘটনায় ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ সালমানের মধ্যে টানা তিন দিন ফোনালাপ হয়। এছাড়া অভিযানের বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যামস, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকভ, ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও। এতকিছুর পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি সৌদি যুবরাজ। এর ফলে অভিযান শুরুর দুই দিনের মধ্যেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বন্ধ করতে বাধ্য হয় ট্রাম্প প্রশাসন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ চলাকালে নিরাপত্তা ও ইরান নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব।

যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিলেও সৌদি আরব নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। এক্ষেত্রে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্ল্যেখ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নেতৃত্বের কাছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়ে অন্যান্য বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনকে গুরুত্ব দিয়েছে সৌদি আরব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সৌদি নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়েছে। তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিলে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে।

এদিকে, কিছু পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে একটি অ-আগ্রাসন চুক্তি (Non-Aggression Pact) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী সৌদি আরব। এক্ষেত্রে দেশটি ভবিষ্যতে পুনর্মিলনী সম্মেলনেরও আয়োজন করতে পারে।

তবে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে এখনও ‘চমৎকার সম্পর্ক’ রয়েছে এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি, নতুন স্থলপথ নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কে নতুন ধরনের অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেএম