চীন প্রশান্ত মহাসাগরে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (এসএলবিএম) বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সমালোচনা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) নৌবাহিনীর মুখপাত্র সিনিয়র ক্যাপ্টেন ওয়াং সুয়েমেং এক বিবৃতিতে বলেন, পিএলএ নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিন ‘একটি ডামি (নকল) ওয়ারহেড বহনকারী কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রশান্ত মহাসাগরের সংশ্লিষ্ট উন্মুক্ত সমুদ্রাঞ্চলের দিকে উৎক্ষেপণ করেছে, যা নির্ধারিত জলসীমায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে।’

ওয়াং বলেন, ‘এই উৎক্ষেপণ পরীক্ষা ছিল চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণ সূচির নিয়মিত অংশ।’ তিনি আরও জানান, পরীক্ষার আগে ‘সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে’ এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে পরিচালিত হয়নি।’

বেইজিং জানায়নি, ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। বর্তমানে পিএলএ নৌবাহিনী দুই ধরনের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করে। এগুলো হলো জেএল-২ এবং জেএল-৩। ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, জেএল-৩-এর পাল্লা এতটাই দীর্ঘ যে দক্ষিণ চীন সাগরসহ চীনের উপকূলবর্তী জলসীমা থেকে উৎক্ষেপণ করেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম।

চীনের প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন হলো টাইপ-০৯৪, যা ‘জিন ক্লাস’ নামেও পরিচিত। বর্তমানে এ ধরনের ছয়টি সাবমেরিন পরিচালনা করছে বেইজিং। চীন খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করে। তবে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম পরীক্ষা চালানো হয় ২০১৮ সালে। এরপর এক বছর পর আরও একবার এর পরীক্ষা হয়।

এদিকে, চীনের এই পরীক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীনের দূর প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, সোমবার চীন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করেছে, সেটি ১৯৮৬ সালে রারোটোঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ প্রশান্ত পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চলের জলসীমায় নিক্ষেপ করা হয়েছে। চীন ১৯৮৭ সালে ওই চুক্তির প্রোটোকল-২ এবং প্রোটোকল-৩-এ স্বাক্ষর করেছিল।

প্রোটোকল-২ অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ওই অঞ্চলের কোনো দেশ বা তাদের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার বা ব্যবহারের হুমকি দিতে পারবে না। আর প্রোটোকল-৩ ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা নিষিদ্ধ করে। পিটার্স বলেন, ‘আজ সোমবা দিনের শুরুতে চীন আমাদের জানিয়েছিল যে তারা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে।’

তিনি বলেন, ‘নিউজিল্যান্ড এই ঘটনাকে অযাচিত এবং উদ্বেগজনক বলে মনে করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মতো আমরাও চাই না, চীন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করুক।’

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং সোমবার এই পরীক্ষাকে ‘এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্টকারী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘চীনের দ্রুতগতির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে না পারার প্রেক্ষাপটে এই পরীক্ষাকে মূল্যায়ন করতে হবে।’ তবে তিনি যোগ করেন, চীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব চীনেরই।

নিউজিল্যান্ডের পিটার্স বলেন, চীনের এই পরীক্ষা ২০২৪ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ওই বছর পিএলএ এই অঞ্চলে একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষামূলকভাবে উৎক্ষেপণ করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের দেশগুলো হিসেবে চুপচাপ বসে থাকা উচিত নয় এবং এ ধরনের পরীক্ষাকে স্বাভাবিক বা নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠতে দেওয়া উচিত নয়।’

তবে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা একটি নিয়মিত বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ফ্লোরিডা উপকূলের কাছে তাদের ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চারটি পরীক্ষা চালায়। এ তথ্য দেশটির নৌবাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এ ছাড়া, ভারত গত ডিসেম্বরে একটি সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় এবং রাশিয়া গত বছরের অক্টোবরে একটি এসএলবিএমের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করে।

নিজেদের সামগ্রিক পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে চীন ধারাবাহিকভাবে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন বহরও সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে।