কুখ্যাত ফরাসি-ভারতীয় ‘বিকিনি কিলার’ চার্লস শোভরাজের জীবন ও কৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দীর্ঘ তিন দশক ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে প্রতারণা চালানোর অভিযোগে এক বৃদ্ধকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, ৬৯ বছর বয়সী অভিযুক্তের নাম বিংসন জন। তিনি মূলত তামিলনাড়ুর বাসিন্দা। ভারতের প্রায় ১০টিরও বেশি রাজ্যে ৩০০-এর বেশি পাঁচতারা ও বিলাসবহুল হোটেলে বিল না মিটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। রায়পুরের একটি হোটেলের অভিযোগের ভিত্তিতে ওডিশার ভুবনেশ্বর থেকে তাঁকে যৌথভাবে গ্রেপ্তার করে রায়পুরের ‘অ্যান্টি-ক্রাইম অ্যান্ড সাইবার ইউনিট’ এবং তেলিবান্ধা থানার পুলিশ।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে বিংসন জনের অভিনব অপরাধকৌশল। অভিজাত হোটেলগুলোতে প্রবেশের জন্য তিনি নিজেকে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কখনো বিদেশি ট্যুর গাইড, কখনো ইংরেজি শিক্ষক, আবার কখনো যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক সেজে হোটেল কর্মীদের বিশ্বাস অর্জন করতেন তিনি।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জন সর্বদা অভিজাত ও বিলাসবহুল কক্ষ বুক করতেন; কয়েক দিন ধরে হোটেলের সমস্ত রকম দামি সেবা ও আতিথেয়তা উপভোগ করতেন; চেক-আউটের ঠিক আগে সুযোগ বুঝে কোনো বিল না মিটিয়েই চম্পট দিতেন; শুধু বিল ফাঁকি দেওয়াই নয়, সুযোগ বুঝে হোটেলের মূল্যবান জিনিসপত্রও চুরি করতেন তিনি।

গত ২৫ জুন ছত্তিশগড়ের রায়পুরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ওঠেন বিংসন জন। ২৭ জুন সকালে হোটেলের ‘চেক-আউট’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই এবং ৬৩ হাজার ৭৫৫ রুপির বকেয়া বিল না মিটিয়ে তিনি হোটেল থেকে পালিয়ে যান।

শুধু তাই নয়, জরুরি কাজের বাহানা দিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি ল্যাপটপ নিয়েছিলেন তিনি। পালানোর সময় সেটিও সঙ্গে নিয়ে যান।

জন নিখোঁজ হওয়ার পর এবং তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষ রায়পুরের তেলিবান্ধা থানার দ্বারস্থ হন। পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-এর ৩১৮(৪) ধারায় প্রতারণার মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে। অবশেষে তাঁর মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে ওডিশার ভুবনেশ্বর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় চুরি যাওয়া ল্যাপটপটি।

পুলিশ জানিয়েছে, ‘অভিযুক্ত স্বীকার করেছেন যে তিনি চার্লস শোভরাজের জীবন দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি শোভরাজের মতোই বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের মেট্রোপলিটন শহরগুলোর বিলাসবহুল হোটেলকে নিশানা করতেন।’

তদন্তে জানা গেছে, দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপরাধ জীবনে জন প্রায় ১৫ বছর দিল্লির তিহার জেলসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে কাটিয়েছেন। পুলিশের দাবি, কারাগারে থাকাকালীন ভারতের একাধিক কুখ্যাত ও দাগি অপরাধীদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সেখান থেকেই প্রতারণার নিত্যনতুন কৌশল রপ্ত করেন, যা পরবর্তীতে দেশের ১০টিরও বেশি রাজ্যে নির্বিঘ্নে প্রতারণা চালাতে তাঁকে সাহায্য করেছিল। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।

বিলাসবহুল হোটেলে থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা বিল ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ভারতে এটিই প্রথম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল মামলা সামনে এসেছে।

২০২২-২৩ সালে মাহামেদ শরিফ নামে এক ব্যক্তি নয়াদিল্লির লীলা প্যালেসে নিজেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রায় ৩ মাস থাকেন। ২৩ লাখ রুপির বেশি বিল না মিটিয়ে এবং দামি জিনিসপত্র চুরি করে পালিয়ে যান। পরে কর্ণাটক থেকে গ্রেপ্তার হন। ২০২৩ সালে অঙ্কুশ দত্ত নয়াদিল্লিতে দ্য রোজিয়েট হাউসে মাত্র এক রাতের বুকিং নিয়ে হোটেল কর্মীদের যোগসাজশে ৬০৩ দিন অবস্থান করেন। বকেয়া ৫৮ লাখ রুপি বিল না মিটিয়েই উধাও হয়ে যান।

বর্তমানে রায়পুর পুলিশ বিংসন জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে আর কী কী মামলা বিচারাধীন রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।