ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনার পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে—তীব্র গরম ও আর্দ্রতা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খেলোয়াড় ও দর্শক—উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এ ধরনের আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের দেহঘড়ি, শারীরিক সক্ষমতা ও ম্যাচের মানও প্রভাবিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, দেশটির পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে চলমান তাপপ্রবাহ সপ্তাহজুড়ে অব্যাহত থাকবে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মিলিয়ে অনুভূত তাপমাত্রা (হিট ইনডেক্স) ৩৮-৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। রাতেও তাপমাত্রা খুব একটা কমবে না, ফলে স্বস্তি মিলবে না।

এরই মধ্যে নিউ জার্সিতে সুইডেনের বিপক্ষে প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে খেলতে গিয়ে ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মাঠের স্প্রিংকলারের পানিতে শরীর ঠান্ডা করতে দেখা গেছে।

বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় চরম গরমে ম্যাচ আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, ফিফার বর্তমান তাপ-নিরাপত্তা নির্দেশিকা পর্যাপ্ত নয়, এমনকি গরমে অভ্যস্ত খেলোয়াড়দের জন্যও তা যথেষ্ট নিরাপদ নয়। এর ফলে ম্যাচের গতি ও তীব্রতাও কমে যেতে পারে।

জলবায়ুবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা বার্কলে আর্থ জানিয়েছে, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ বিশ্বকাপ আয়োজনের পর গত তিন দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এতে তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরো ঘন ঘন ঘটছে।

এদিকে, ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কিছু অঞ্চলে যে তীব্র গরম ও আর্দ্রতা দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন পরিস্থিতি প্রায় অসম্ভব ছিল।

এর আগেও চরম গরমের কারণে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ গ্রীষ্মের বদলে শীতকালে আয়োজন করা হয়েছিল। গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপেও তাপমাত্রা ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। খেলোয়াড়দের বৈশ্বিক সংগঠন ফিফপ্রো (এফআইএফপিআরও) আগেই সতর্ক করেছিল, এবারের এবং আগামী বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরম আরো বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে গরম ম্যাচগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওল্যান্ডোতে। সে সময় অনুভূত তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমে খেলোয়াড়দের শরীর বাইরের তাপের পাশাপাশি দৌড়ঝাঁপের কারণে ভেতর থেকেও দ্রুত উত্তপ্ত হয়। ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) হিট ল্যাব-এর পরিচালক ভারত ভেঙ্কট বলেন, “যখন খুব গরমের দিনে কেউ তীব্র শারীরিক পরিশ্রম করে, তখন তাপজনিত অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।”

 

অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় খেললে চরম ক্লান্তি, পারফরম্যান্স কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, বিরক্তিভাব, বমিভাব, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান এবং পানিশূন্যতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলো তাপজনিত শারীরিক অসুস্থতার সাধারণ লক্ষণ বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল পলিসির জলবায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক উদ্‌যাপন ব্যাহত হওয়া এবং বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়া—এসব দেখে মানুষকে সচেতন করতে আর নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।”

উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখনই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উপভোগ্য বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করছে। আর কার্বন নিঃসরণ কমাতে যত দেরি হবে, পরিস্থিতি ততই খারাপ হবে।”

গত ডিসেম্বরে ফিফা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য বিবেচনায় রেখে সূচি ও ভেন্যু পরিকল্পনার কিছু উদ্যোগ নেয়। তবে এখনো কিছু ম্যাচে ঝুঁকি রয়ে গেছে। পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, ভবিষ্যতে টুর্নামেন্ট ও লিগের সূচি নির্ধারণে তাপমাত্রা আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে ফিফপ্রো। 

তবে এখনো ফিফার এমন কোনো বাধ্যতামূলক নীতিমালা নেই, যাতে চরম গরমের কারণে কোনো ম্যাচ স্থগিত করা হবে। তাই খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: এপি নিউজ, রয়টার্স