ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে (২০-২২ জুন) শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুটি পৃথক মসজিদের দুই ইমাম গ্রেপ্তারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিযুক্তদের অতীত জীবন, পরিচয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ ও যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া দুই ইমামের কেউই কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। এ ঘটনায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জোরালো হয়েছে।
সচেতন সমাজের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মতে, মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবে অনেক সময় যোগ্যতা যাচাই না করে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্বে অনেকে আসীন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই স্থানীয় সুপারিশের ভিত্তিতে ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়।
তাঁদের মতে, মসজিদ কমিটিতে দায়িত্বশীল, সৎ ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করা এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়োগকারী কমিটির জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত দুজনের একজনের বিরুদ্ধে অতীতেও আচরণগত অভিযোগ ছিল। অন্যজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও এলাকায় বিভিন্ন আলোচনা ছিল।
পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ইমাম শাহিনুর ইসলামের (৪৫) বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বেলুয়া গ্রামে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে পরিচিত এক ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে কোরআন-হাদিস ও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। কয়েক বছর তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ধর্মীয় পোশাক ধারণ করে এলাকায় ফিরে আসেন। নিজেকে আহলে হাদিস মতের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। পরে তিনিই ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হাই এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
অপর শিশু ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মো. ইব্রাহিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ মন্তব্য করেছেন ত্রিশালের আলেম মুফতি আতিকুর রহমান নোমানী।
তিনি দাবি করেন, ইব্রাহিম একটি সম্মানিত আলেম পরিবারের সদস্য হলেও নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা নেননি। আলেমের লেবাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অনেক বিয়ে করেছেন। তালাক হয়েছে, গন্ডগোল হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, প্রায় ১৫ বছর আগে প্রতিবেশী এক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছিল।
ইব্রাহিমের একাধিক বিয়ের বিষয়টি স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল মিয়াও নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় শিক্ষক, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও অভিভাবকদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত ইমাম শাহিনুর ইসলামের বাবা বলেন, ‘এর আগে আমার ছেলের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।’
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি অসুস্থতার কারণে গত এক বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করছি। শাহিনুর ইসলামের নিয়োগের সময় স্থানীয়ভাবে তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণাই পেয়েছিলাম। পরে তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠবে, তা কল্পনাও করিনি। অভিযোগের বিষয়টি জানার পর আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতে ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।’
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহাম্মদ বলেন, ‘দুটি পৃথক ঘটনায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। নির্যাতনের মতো ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’
পুলিশ জানিয়েছে, দুটি মামলার তদন্ত চলমান। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায়ের মাধ্যমেই অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারিত হবে।








