কাচের স্বচ্ছ জারে নিথর শত শত প্রাণী। কোথাও ফরমালিনে ডুবে থাকা বিরল সরীসৃপ, কোথাও আবার নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত পাখি কিংবা স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহাবশেষ। এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের কঙ্কাল, অন্য পাশে সাজানো কোটি বছরের ইতিহাস বয়ে আনা জীবাশ্ম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরে প্রবেশ করলেই দেখা মিলবে শত শত বছরের প্রকৃতির ইতিহাস।

দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ এই প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরটি নিঃশব্দে ধারণ করে আছে জীববৈচিত্র্য, বিবর্তন এবং বিলুপ্তির দীর্ঘ ইতিহাস। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম হলেও অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি রাজশাহীর সাধারণ মানুষের কাছেও এর অস্তিত্ব প্রায় অজানা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক নাম ‘অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। ১৯৭২ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রয়াত শিক্ষক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় এর। পরে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাদুঘরটির নামকরণ করা হয়।

‘বইয়ে যেসব প্রাণী আমরা শুধু নাম ও ছবি হিসেবে পড়েছি, এখানে এসে সেগুলো বাস্তবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে জীবাশ্মগুলো দেখে মনে হয়েছে আমরা যেন ইতিহাসের অনেক গভীরে চলে গেছি। তবে জাদুঘরটি যদি আরও আধুনিকভাবে সাজানো হতো, তাহলে অভিজ্ঞতাটা আরও সমৃদ্ধ হতো’

প্রকৃতির হাজারো রূপ এক ছাদের নিচে

জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে টাঙানো নানা প্রজাতির পাখির আলোকচিত্র। এগুলো তুলেছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষকরা। আর সারি সারি আলমারি, কাচের বাক্স ও জারে সংরক্ষিত নমুনাগুলো যেন নীরবে বলে যায় পৃথিবীর প্রাণিকুলের বিবর্তনের গল্প।

কাচের জারে বন্দি শত বছরের ইতিহাসবিলুপ্ত প্রাণীর স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে রাবি জাদুঘরে/ ছবি: জাগো নিউজ

এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ও বিরলসহ ১ হাজার ৫৪৩টি প্রাণীর প্রক্রিয়াজাত নমুনা। পাশাপাশি রয়েছে ১৪২টি দুর্লভ জীবাশ্ম, যা গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিফেরা থেকে শুরু করে ম্যামালস- প্রাণিজগতের প্রায় সব প্রধান পর্বের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এই সংগ্রহে।

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই দেখা মিলবে বনরুই, সজারু, উদবিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির বিড়াল, মাছরাঙা, বিরল সাপ, কুমির, শুশুক, ডলফিন, সামুদ্রিক মাছ, মিঠাপানির মাছ, প্রবাল, কোরাল, মলাস্কা এবং অগণিত কীটপতঙ্গের। রয়েছে মানবভ্রূণ, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং নারী-পুরুষের দুটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালও।

আরও পড়ুন

বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’

শুধু তাই নয়, হাতি, ঘোড়া ও কুমিরের কঙ্কাল যেমন এখানে স্থান পেয়েছে, তেমনি সংরক্ষিত আছে জীবন্ত ফসিল হিসেবে পরিচিত কিছু বিরল প্রাণীর নমুনাও। পেট্রোমাইজন ও মিক্সিনসহ ১৯ প্রজাতির ৩৩টি কোরাল এবং ৪৫ ধরনের মলাস্কার খোলসও রয়েছে সংগ্রহশালায়।

গবেষণার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা:

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর থাকলেও সংগ্রহের বৈচিত্র্য ও পরিসরের বিচারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জাদুঘরকে আলাদা করে দেখেন গবেষকরা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বিভাগের ব্যবহারিক ক্লাস ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এখানকার সংগ্রহ ব্যবহার করে।

‘এখানে প্রতিটি নমুনার মধ্যে একটা গল্প আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে সামুদ্রিক প্রাণী ও মানব কঙ্কালের সংগ্রহ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকেই জানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর আছে। প্রচার বাড়ানো দরকার’

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিবিদ্যা, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে গবেষণার জন্য এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে।

জাদুঘর ঘুরে দেখা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, বইয়ে যেসব প্রাণী আমরা শুধু নাম ও ছবি হিসেবে পড়েছি, এখানে এসে সেগুলো বাস্তবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে জীবাশ্মগুলো দেখে মনে হয়েছে আমরা যেন ইতিহাসের অনেক গভীরে চলে গেছি। তবে জাদুঘরটি যদি আরও আধুনিকভাবে সাজানো হতো, তাহলে অভিজ্ঞতাটা আরও সমৃদ্ধ হতো।

কাচের জারে বন্দি শত বছরের ইতিহাস

দীর্ঘদিন ধরে পাখি নিয়ে গবেষণা করা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ্ রেজা বলেন, প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরের সংগ্রহ অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। এখানে শুধু সাধারণ প্রাণী নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি, দুর্লভ জীবাশ্ম এবং স্থলজ, জলজ ও সামুদ্রিক প্রাণীর বিপুলসংখ্যক নমুনা অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংগ্রহশালা শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রাণিবৈচিত্র্য, বিবর্তন ও পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স কেন্দ্র। সংগ্রহের পরিমাণ, বৈচিত্র্য এবং গবেষণার সম্ভাবনার দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম সেরা প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আরও পড়ুন

মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংগ্রহশালা এই জাদুঘর

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এই জাদুঘরে প্রাণিজগতের প্রায় সব প্রধান পর্বের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। পরিফেরা থেকে শুরু করে ম্যামালস পর্যন্ত- প্রাণীর প্রতিটি বড় গোষ্ঠীর নমুনা এখানে সংরক্ষিত আছে, যা শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরাও এই জাদুঘরের সংগ্রহকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত আধুনিকায়নের অভাবে এর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সম্ভাবনার পাশে সীমাবদ্ধতার দেয়াল

সংগ্রহে সমৃদ্ধ হলেও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলছে জাদুঘরটির কার্যক্রম। মিউজিয়াম অ্যাটেনডেন্ট কেতাব আলীর ভাষ্য, সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ফরমালিনের অভাব রয়েছে। দক্ষ ট্যাক্সিডার্মিস্ট না থাকায় অনেক নমুনা সংরক্ষণও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় অনেক মূল্যবান সংগ্রহ দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।

‘প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরের সংগ্রহ অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। এখানে শুধু সাধারণ প্রাণী নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি, দুর্লভ জীবাশ্ম এবং স্থলজ, জলজ ও সামুদ্রিক প্রাণীর বিপুলসংখ্যক নমুনা অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে’

বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, জায়গার সংকট ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে জাদুঘরটিকে আধুনিক রূপ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে প্রয়োজনীয় প্রকল্প ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রদর্শনীকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

প্রচারের অভাবে আড়ালে জাদুঘর

শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য পাঁচদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে। অনুমতি সাপেক্ষে দর্শনার্থীরাও এটি ঘুরে দেখতে পারেন। কিন্তু প্রচারের অভাবে এত সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা আজও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

কাচের জারে বন্দি শত বছরের ইতিহাস

জাদুঘর পরিদর্শন করা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম জানান, এখানে প্রতিটি নমুনার মধ্যে একটি গল্প আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে সামুদ্রিক প্রাণী ও মানব কঙ্কালের সংগ্রহ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকেই জানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর আছে। প্রচার বাড়ানো দরকার।

আরও পড়ুন

বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম

জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর স্মৃতি এবং গবেষণার অমূল্য উপাদান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জাদুঘর শুধু একটি প্রদর্শনীকক্ষ নয়; এটি প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের এক জীবন্ত দলিল। যথাযথ পরিচর্যা ও প্রচার পেলে দেশের প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণায় এটি হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য জাতীয় সম্পদ।

এনএইচআর/এএসএম