স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলির আদেশ অনুযায়ী ২০ মে থেকেই কর্মস্থল ছাড়ার কথা ছিল লালমনিরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু আল হাজ্জাজের। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তিনি আরও ২০ দিন দায়িত্বে থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেছেন। এমনকি মন্ত্রী হাসপাতালে না এলেও তার আপ্যায়নের নামে এক লাখ টাকার বেশি বিল উত্তোলন করেছেন তিনি।

চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসক সংকট, নোংরা পরিবেশ, নিম্নমানের খাবার ও ওষুধ চুরির অভিযোগে আলোচিত এ হাসপাতালে কেনাকাটা ও আপ্যায়নের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ মে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের (পার-২ শাখা) যুগ্মসচিব সনজীদা শরমিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ডা. আবু আল হাজ্জাজকে লালমনিরহাট থেকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে নীলফামারীর তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরশাদ হোসেনকে লালমনিরহাটের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ওই প্রজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, বদলিকৃত কর্মস্থলে ১৯ মে মধ্যে যোগদান করতে হবে, অন্যথায় ২০ মে থেকে তিনি ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ (তাৎক্ষণিক অবমুক্ত) মর্মে গণ্য হবেন। কিন্তু ডা. হাজ্জাজ সরকারি এ আদেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২০ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত লালমনিরহাট হাসপাতালেই অবৈধভাবে অবস্থান করেন।

অভিযোগ উঠেছে, এ ২০ দিনের ডা. হাজ্জাজ নিজের ইচ্ছামতো হাসপাতালের কোষাগারের টাকা লুটপাটের নীল নকশা বাস্তবায়ন করেন। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি করে বিল-ভাউচারে সই করেছেন তিনি। ক্রয়-সরবরাহ, সেবা বাবদ ব্যয়, ট্রাক ভাড়া এবং নাস্তা খরচের নামে এসব ভুয়া বিল তৈরি করেন তিনি।

সবশেষ ৯ জুন বিকেলে হাসপাতাল ছাড়ার আগ পর্যন্ত অবৈধভাবে প্রায় বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করে তড়িঘড়ি করে দিনাজপুর পাড়ি জমান এ কর্মকর্তা। ততক্ষণে সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে যায় বিপুল পরিমাণ অর্থ। যদিও বেশ কয়েকটি বিল-ভাউচারে আগের তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্ট্যান্ড রিলিজের পরও ছাড়েননি দায়িত্ব, ২০ দিনে তুলেছেন ২০ লাখ টাকা

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর একটি বাতিল হওয়া হাসপাতাল সফরকে ঘিরে। গত ১১ এপ্রিল মন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি সফর বাতিল করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সফর বাতিল হলেও তার আপ্যায়নের জন্য নাস্তা ও দুপুরের খাবারের নামে এক লাখ টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে প্রায় ৯২ হাজার টাকার ওই বিলের বেশিরভাগ খরচ রংপুরে দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ার পরও লাখ লাখ টাকার বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে দায়সারা উত্তর দেন ডা. আবু আল হাজ্জাজ।

তিনি সুকৌশলে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, বদলির আদেশ তো হয়নি। সরকারি ওয়েবসাইটেও দেখিনি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে, রিলিজ আমি নেব আরকি। ৯ জুন আপডেট জানার পরেই আমি রিলিজ নেওয়ার কথা বলেছি।

তবে অবৈধভাবে বিল পাসের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। গণমাধ্যমের হাতে তার স্বাক্ষর করা নথিপত্র থাকার কথা জানালেও তিনি তা স্বীকার করতে রাজি হননি।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হন। তিনি জানান, এ অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। বিষয়টি শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নজরে না থাকায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

মহসীন ইসলাম শাওন/কেএইচকে/এএসএম