জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩১৮টি প্রায় দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের মধ্যে ১১২টি চায়না রাইফেলও রয়েছে। এগুলো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে গিয়ে থাকলে তা উদ্বেগের বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উদ্ধার না হওয়া গোলাবারুদের সংখ্যা ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি। পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, লুণ্ঠিত ৮০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, বাকি ২০ শতাংশ উদ্ধারে অভিযান চলছে। কিছু অস্ত্র বেচাকেনা হয়েছে, আবার কিছু অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুট, অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব স্থান থেকে ১১ ধরনের ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৪৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার না হওয়া ১ হাজার ৩১৮টি অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১১২টি চায়না রাইফেল, ৩৮৪টি শটগান, ৪৪৫টি ৯ মিমি পিস্তল, ২০৫টি ৭.৬২ পিস্তল, ১২৮টি ৩৮ মিমি গ্যাসগান, ৩১টি এসএমজি (টি-৫৬ চায়না), ৭টি টিয়ার গ্যাস লাঞ্চার, ৩টি এলএমজি, ২টি ২৬ মিমি পিস্তল এবং একটি টি-০৮ রাইফেল।
পুলিশের লুট হওয়া অনেক অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছ থেকেও উদ্ধার হয়েছে। ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডেও লুণ্ঠিত অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তাই পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি অংশ সন্ত্রাসীদের কাছে আছে।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে পুলিশের লুট হওয়া একটি পিস্তল ও আটটি গুলিসহ রনি নামে এক সন্ত্রাসীকে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করে র্যাব। এর আগে গত বছরের ২১ জুলাই চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে সন্ত্রাসী ইসমাইল হোসেন ওরফে টেম্পো এবং শহিদুল ইসলাম ওরফে বুইসার গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির পর পুলিশ বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকায় শহিদুল ইসলামের একটি আস্তানা পায়। সেখানে থানা থেকে লুট হওয়া দুটি গুলি ও গুলির খোসা পাওয়া যায়। এরপর ২৯ আগস্ট চট্টগ্রামের কুয়াইশ এলাকায় মাসুদ কায়সার ও মো. আনিস হত্যার ঘটনাস্থল থেকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার পুলিশ পাঁচটি গুলির খোসা (শটগানের কার্তুজ) উদ্ধার করে। যেগুলো থানা থেকে লুট হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। একই বছরের ৩ মার্চ সাতকানিয়ায় পিটুনিতে দুজনের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ যে পিস্তল উদ্ধার করে, সেটিও নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া। পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তিদের একজন নেজাম উদ্দিন পিস্তলটি সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটেও বিভিন্ন সন্ত্রাসীর কাছ থেকে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, থানা থেকে পুলিশের লুট করা অস্ত্র কোনো ভালো মানুষ নেয়নি। নিয়েছে অপরাধীরাই। ওই অস্ত্র দিয়ে তারা যেকোনো অপরাধ করতে পারে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময় তা দেখাও গেছে। লুট হওয়া অস্ত্রের বেশির ভাগ উদ্ধার করায় উদ্বেগ কিছু কমেছে। তবে চায়না রাইফেলের মতো শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য উদ্বেগের। এগুলো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে থাকলে, তা যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে গেছে। এই অস্ত্র বেচাকেনা হয়েছে, কখনো কখনো সন্ত্রাসীরা ভাড়ায় খাটিয়েছে বলেও তাঁদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন সাফল্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্ব চলছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এস এম শাহাদাত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের ৮০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকি ২০ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান এখনো চলছে। তিনি বলেন, ‘কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসীরা বেচাকেনা করেছে, কিছু অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীদের কাছে এসব অস্ত্র গেলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ কেউ হয়তো এগুলো লুকিয়ে রেখেছে। তবে যার কাছেই থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।








