উপকূলীয় কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে অবস্থিত আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীন পরিচালিত এ কেন্দ্রটি দক্ষিণাঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্যের উপযোগী ফল ও সবজির নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
জানা গেছে, বর্তমানে কেন্দ্রটিতে সিম, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, শসা ও ঢেঁড়সের নতুন জাত উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রের গবেষণায় উদ্ভাবিত বারি বেগুন-১২, বারি তরমুজ-১ এবং বারি তরমুজ-২ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়া সারা বছর চাষ উপযোগী ‘বারি হাইব্রিড মিষ্টি কুমড়া-৪’ নামে একটি নতুন জাত নিবন্ধনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
গবেষণা কেন্দ্র সূত্র জানায়, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সবজি ফসলের প্রজনন বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে বারি বেগুন-১২, বারি তরমুজ-১, বারি তরমুজ-২, বারি লাউ-৩, বারি লাউ-৪, বারি লালশাক-১, বারি ডাটাশাক-১, বারি হাইব্রিড করলা-২ এবং বারি হাইব্রিড মিষ্টি কুমড়া-২ এর প্রজনন বীজ উৎপাদন করা হয়েছে।
‘আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে ড্রাগন চাষ শুরু করি। বর্তমানে ছোট পরিসরে আমার একটি ড্রাগন বাগান রয়েছে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় আমি ড্রাগন চাষে উৎসাহিত হয়েছি এবং ভবিষ্যতে বাগান আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
সবজি গবেষণার পাশাপাশি ফলজ ফসল নিয়েও ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেন্দ্রটি। আম, ড্রাগন ফল, পেয়ারাসহ কলা, বরই ও মাল্টার বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা ও প্রদর্শনী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একইসঙ্গে কৃষকদের মধ্যে মানসম্পন্ন চারা সরবরাহের জন্য বিভিন্ন ফলজ গাছের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
চলতি বছর কেন্দ্রটিতে বারি আম-৩ এর ১ হাজার ২৫০টি, বারি আম-৪ এর ১ হাজার ৪০০টি, বারি আম-৮ এর ৪০০টি এবং বারি আম-১১ এর ১ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছে। এছাড়াও বারি ড্রাগন, বারি পেয়ারা, বারি কুল, মাল্টা, নারিকেল, লিচু ও কলাসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের চারা উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

গবেষণা চলছে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে/ ছবি: জাগো নিউজ
গবেষণা ও চারা উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কেন্দ্রটি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, প্রযুক্তি প্রদর্শনী এবং পরামর্শ সেবার মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ফলে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ফল ও সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এবং নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছেন।
উদ্যোক্তা শারমিন আক্তার বলেন, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে ড্রাগন চাষ শুরু করি। বর্তমানে ছোট পরিসরে আমার একটি ড্রাগন বাগান রয়েছে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় আমি ড্রাগন চাষে উৎসাহিত হয়েছি এবং ভবিষ্যতে বাগান আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘মানসম্মত চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নত জাতের সবজি ও ফল উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে নিয়মিত কাজ করছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের উপযোগী মাল্টা, লেবুসহ বিভিন্ন রসালো ফলের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে তাদের কার্যক্রম প্রশংসনীয়।’
স্থানীয় কৃষক সেলিম মিয়া বলেন, আমি এখানে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণে কৃষিকে কীভাবে বৈজ্ঞানিক ও লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষিকাজ সম্পর্কে অনেক নতুন বিষয় জানতে পেরেছি। এখন সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে চাষাবাদ করছি এবং আগের চেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছি।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফল ও সবজি ফসল নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে আসছি আমরা। ইতোমধ্যে বারি বেগুন-১২ নিবন্ধিত হয়েছে, বারি সিম-১১ নিবন্ধিত হয়েছে। বারি হাইব্রিড মিষ্টি কুমড়া-৪ জাতটির নিবন্ধনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ঢ্যাঁড়স, সিমসহ আরও কয়েকটি ফসলের উন্নয়ন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। ভবিষ্যতে এসব জাত নিবন্ধনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য জলবায়ু সহনশীল, অধিক ফলনশীল এবং লাভজনক জাত উদ্ভাবনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের কৃষি উৎপাদন আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান জাগো নিউজকে বলেন, লেবুখালী আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের উদ্ভাবিত বারি বেগুন-১২ একটি ব্যতিক্রমধর্মী জাত, যা দেখতে অনেকটা লাউয়ের মতো এবং প্রতিটি বেগুনের ওজন এক থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
‘উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য জলবায়ু সহনশীল, অধিক ফলনশীল এবং লাভজনক জাত উদ্ভাবনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের কৃষি উৎপাদন আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এ ধরনের উচ্চ ফলনশীল ও লাভজনক জাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। গবেষণা কেন্দ্রটি যেভাবে নতুন জাত উদ্ভাবন, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সেই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আমি মনে করি, এ ধরনের গবেষণা কার্যক্রম আমাদের অঞ্চলের কৃষির জন্য এক বড় আশীর্বাদ।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা কার্যক্রমের সুফল ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক কৃষক পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মানসম্মত চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নত জাতের সবজি ও ফল উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে নিয়মিত কাজ করছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের উপযোগী মাল্টা, লেবুসহ বিভিন্ন রসালো ফলের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে তাদের কার্যক্রম প্রশংসনীয়।
এনএইচআর/জেআইএম








