সংগীতাঙ্গনে কিছু কণ্ঠ সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে গানের ধারা, প্রযুক্তি আর শ্রোতার রুচি। কিন্তু কিছু গান আজও মানুষের হৃদয়ে একইভাবে অনুরণিত হয়। সেই গানগুলোর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোরের নাম। তিনি নেই, তবু তার কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান আজও ফিরিয়ে নেয় শ্রোতাদের এক স্বর্ণালি সংগীত-সময়ে।

আজ (৬ জুলাই) তার প্রয়াণদিবসে স্মরণে আসে শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পী নন, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের এক অনন্য অধ্যায়। এন্ড্রু কিশোরের গান মানেই প্রেম, বিরহ, জীবনের দর্শন, মানবিকতা, আশা-হতাশা আর মানুষের না-বলা অনুভূতির এক অনবদ্য প্রকাশ।

রাজশাহীর বুলনপুর মিশন কম্পাউন্ড, মহিষবাথান হাসপাতাল কোয়ার্টার এবং কাজীরহাটা কোয়ার্টারে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই ভর্তি হন রাজশাহীর ‘সুরবাণী’ সংগীত বিদ্যায়তনে। সেখানে ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে এন্ড্রু কিশোর বলেছিলেন, তার ওস্তাদ কণ্ঠ বিশ্লেষণে ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। কোন শিল্পীর কণ্ঠে কী ধরনের গান মানাবে, তা তিনি সহজেই বুঝে নিতে পারতেন। রাজশাহীর বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর মতো এন্ড্রু কিশোরও ছিলেন তারই ছাত্র।

শৈশবের সেই সংগীতশিক্ষাই একসময় তাকে নিয়ে যায় ঢাকার চলচ্চিত্রাঙ্গনে। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীত নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল, তখন সেই সময়ের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হয়ে ওঠেন এন্ড্রু কিশোর। মাহমুদুন্নবী, খুরশিদ আলম, বশীর আহমদ, সৈয়দ আব্দুল হাদী ও সুবীর নন্দীর মতো কিংবদন্তিতুল্য শিল্পীদের পাশে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন তিনি।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বলে প্রচলিত রয়েছে। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা হয়নি, তবে তার গাওয়া অসংখ্য গান যে বাংলা গানের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

১৯৮২ সালে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমায় গাওয়া ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস’ গানটি তাকে এনে দেয় প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এরপর একে একে মোট আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরেও মানুষের হৃদয়ে যে ভালোবাসা তিনি অর্জন করেছেন, সেটিই তার সবচেয়ে বড় সম্মান।

আরও পড়ুন

‘ফ্যাসিস্ট ফিরে এসেছে তিনটি পথে’, দাবি আসিফের

এন্ড্রু কিশোরের গান শুনলেই যেন ভেসে ওঠে একটি সময়ের বাংলাদেশ। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘আমার বুকের মধ্যখানে’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘কী জাদু করিলা’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমি চিরকাল প্রেমের কাঙাল’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘জীবন ফুরিয়ে যাবে ভালোবাসা ফুরাবে না জীবনে’, ‘বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’ কিংবা ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’-এমন অসংখ্য গান আজও মানুষের আবেগের অংশ হয়ে আছে।

তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের আন্তরিকতা, যা শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যেত সহজেই। প্রেমের গান যেমন গেয়েছেন, তেমনি সমান দক্ষতায় গেয়েছেন বিচ্ছেদের গান, জীবনমুখী গান, আধ্যাত্মিক গান কিংবা দেশপ্রেমের গান। ফলে তার গানের পরিসর ছিল বিস্তৃত, আর গ্রহণযোগ্যতাও ছিল সর্বজনীন।

এন্ড্রু কিশোরের সাফল্যের পেছনে ছিল একদল অসাধারণ গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালকের সম্মিলিত সৃষ্টিশীলতা। সৈয়দ শামসুল হক, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনির, আলাউদ্দিন আলী, শেখ সাদী খান, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানসহ অসংখ্য কীর্তিমান স্রষ্টার লেখা ও সুরে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসেই বাংলা চলচ্চিত্রের গান একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।

যে গানগুলো আজও ফিরিয়ে নেয় এন্ড্রু কিশোরের কাছেএন্ড্রু কিশোর। ছবি: সংগৃহীত

সংগীতবোদ্ধারা মনে করেন, এন্ড্রু কিশোরকে শুধু একজন শিল্পী হিসেবে দেখলে তার অবদান পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন চলচ্চিত্রের গানই ছিল মানুষের বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সিনেমা মুক্তির আগেই গান জনপ্রিয় হতো, ক্যাসেটের দোকানে ভিড় জমত, রেডিও-টেলিভিশনে বারবার বাজত সেই গান। আর সেই সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কণ্ঠগুলোর একটি ছিল এন্ড্রু কিশোর।

তার গাওয়া গানগুলো শুধু সুরের সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং কথার গভীরতার কারণেও মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। সহজ-সরল ভাষায় লেখা সেই গানগুলোতে ছিল প্রেম, বেদনা, দর্শন, পারিবারিক আবেগ, সমাজবাস্তবতা এবং মানুষের অন্তর্গত অনুভূতির প্রকাশ। তাই তার গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কল্যাণে সংগীতের বিস্তার অনেক বেড়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, এন্ড্রু কিশোরদের সময়ের মতো গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং শিল্পীদের সম্মিলিত সৃজনশীল চর্চা এখন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে সেই সময়ের গান আজও নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান আবেদন নিয়ে ফিরে আসে।

এন্ড্রু কিশোরের জীবন আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়-একজন বড় শিল্পী তৈরি হওয়ার পেছনে প্রয়োজন দীর্ঘ সাধনা, প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। রাজশাহীর ‘সুরবাণী’ সংগীত বিদ্যালয় যেমন গড়ে তুলেছিল এন্ড্রু কিশোরকে, তেমনি দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে সংগীতচর্চার সেই পরিবেশ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই।

আজও কোথাও যখন ভেসে আসে- ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’ কিংবা ‘আমার বুকের মধ্যখানে’-তখন অজান্তেই ফিরে আসে এন্ড্রু কিশোরের মুখ। মনে পড়ে সেই সোনালি সময়ের কথা, যখন একটি গান পুরো দেশকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারত।

খ্যাতিমান এ শিল্পীর মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েক বছর। কিন্তু সময় যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে তার শিল্পীসত্তার মাহাত্ম্য। তিনি নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ, তার গান এবং তার রেখে যাওয়া সংগীতভাণ্ডার আজও বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। আর তাই বলা যায়, এন্ড্রু কিশোরকে খুঁজে পেতে আলাদা কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না-তার গানগুলোই আজও শ্রোতাদের বারবার ফিরিয়ে নেয় সেই প্রিয় শিল্পীর কাছে।

১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব-কৈশোর ও যৌবনকাল কেটেছে রাজশাহী। তার মা ছিলেন সংগীত অনুরাগী, তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন কিশোর কুমার। প্রিয় শিল্পীর নামানুসারে তার সন্তানের নাম রাখেন ‘কিশোর’। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই তিনি সংগীতাঙ্গনেই পা রাখেন। তিনি ছয় বছর বয়স থেকে সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন।

এন্ড্রু কিশোর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক ও দেশাত্মবোধক গান শ্রেণিতে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন। কিশোর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন।

আরও পড়ুন

মার্চে মৌসুমীর বিচ্ছেদের খবর, জুলাইয়ে মাতৃত্বের

চলচ্চিত্রের গানের জন্য আরও সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি পাঁচবার বাচসাস পুরস্কার ও দুইবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।

এমএমএফ