ফুটবলের ইতিহাস সব সময় শুধু বিজয়ীদের মনে রাখে না, কিছু বিদায় এমন হয় যা ট্রফির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত আর শ্রদ্ধা রেখে যায়। এবারের বিশ্বকাপে তেমনই এক বুকভাঙা কাব্যের নাম ইরান। কোনো ম্যাচ না হেরেও, বুক চিতিয়ে লড়াই করেও বিদায়ের নির্মম ট্র্যাজেডি সঙ্গী করে তেহরানের বিমান ধরতে হয়েছে তাদের। 

অথচ সমান পয়েন্ট নিয়ে যখন অন্য দলগুলো উল্লাসে মেতেছে, তখন ইরানকে বিদায় নিতে হয়েছে কেবল ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেয়ালে। ফুটবল আসলেই নিষ্ঠুর, কখনো তা কয়েক সেকেন্ডে স্বপ্ন আকাশছোঁয়া করে, আবার কখনো এক মুহূর্তে সব দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

শেষ ম্যাচের আগে সমীকরণটা কিন্তু খুব জটিল ছিল না ইরানের জন্য। তাদের সামনে টিকে থাকার অনেকগুলো পথ খোলা ছিল। কিন্তু নিয়তি যেন সেদিন অলক্ষ্যে বসে অন্য এক চিত্রনাট্য লিখছিল। উজবেকিস্তান এগিয়ে গিয়েও ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জয় হাতছাড়া করল, ক্রোয়েশিয়াও হারল না। আর অন্য মাঠে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি রূপ নিল চরম এক নাটকে। ইরান যেসব সমীকরণের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল, তার একটিও তাদের পক্ষে এলো না।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো আলজেরিয়া আর অস্ট্রিয়ার সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ থেকে। ম্যাচের ২৮ মিনিটে মার্কো আর্নাউটোভিচ অস্ট্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পর প্রথমার্ধেই সমতা ফেরান রফিক বেলগালি। ৫৫ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজের আত্মঘাতী গোলে অস্ট্রিয়া আবারও লিড নিলে ইরানি শিবিরে শঙ্কার মেঘ জমে। কিন্তু নিজের ভুল শুধরে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মাহরেজ গোল করে সমতা আনেন।

আসল ট্র্যাজেডি তখনো বাকি ছিল যোগ করা সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন সেই মাহরেজ। গ্যালারিতে তখন ইরানি সমর্থকদের চোখে আনন্দের জল, নকআউটের স্বপ্ন তখন হাতছোঁয়া দূরত্বে। কিন্তু ফুটবল বিধাতা হয়তো অন্য কিছু চেয়েছিলেন। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে এক অবিশ্বাস্য হেডে সমতা ফেরায় অস্ট্রিয়া। ৩-৩ স্কোরে ম্যাচ শেষ হতেই আলজেরিয়া আর অস্ট্রিয়া মেতে ওঠে যৌথ উদযাপনে, আর মেক্সিকোর মাটিতে বসে থাকা ইরানি ফুটবলারদের চোখ ফেটে জল নামে। মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় তাদের শেষ ষোলোর স্বপ্ন।

তবে ইরানের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের গল্প ছিল না। এটি ছিল এক চরম বৈষম্য, লড়াই আর বঞ্চনার আখ্যান। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলা হলেও রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে ইরানকে থাকতে হয়েছিল মেক্সিকোতে। প্রতিটি ম্যাচ শেষে যখন অন্য দলগুলো বিশ্রামে মগ্ন, তখন ইরান দলকে ম্যাচ শেষ হতেই তাড়াহুড়ো করে ছাড়তে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত। এই চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির প্রতিকার চেয়ে ফিফার দরজায় কড়া নেড়েছিল ইরান। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি যেন মার্কিন প্রশাসনের নীরব দর্শক হয়েই রইল।

অথচ টুর্নামেন্টের শুরুতে নিউজিল্যান্ড ম্যাচের পর স্বয়ং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইরানের ড্রেসিংরুমে গিয়ে সমস্যা সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত কেবলই ফাঁকা আওয়াজ হয়ে রইল।

এই বঞ্চনার ইতিহাস অবশ্য আরও দীর্ঘ। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ১০ দিন আগে ফুটবলাররা ভিসা হাতে পান। দলের প্রধান কোচিং স্টাফ আর সাপোর্ট স্টাফদের অনেকেই ভিসাই পাননি। অ্যারিজোনায় তাদের পূর্বনির্ধারিত বেস ক্যাম্প বাতিল করে মেক্সিকোতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। মাঠের বাইরে সমর্থকরাও হয়েছেন নানাভাবে হয়রানির শিকার।

এত ক্ষত, এত অপমান বুকে চেপেও মাঠে কিন্তু বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি পারস্যের বীরেরা। তারা হারেনি, প্রতিটি ম্যাচে বুক চিতিয়ে লড়ে পয়েন্ট ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাধ্য কার? ভাগ্য যদি একটু সদয় হতো, তবে হয়তো মিসর ম্যাচের সেই শেষ মুহূর্তের গোলটি অফসাইডে বাতিল হতো না, কিংবা আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচ ওভাবে ড্র হতো না।

আফ্রিকার আলজেরিয়া শেষ দল হিসেবে রাউন্ড অব থার্টি টুতে পা রাখল, আর একটি ম্যাচও না হেরে অপরাজিত থেকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল ইরান।

কাগজে-কলমে স্কোরবোর্ড হয়তো বলবে ইরান ব্যর্থ। কিন্তু ফুটবলের মূল স্পিরিট যারা বোঝেন, তারা জানেন এই ইরান কোনো সাধারণ দল ছিল না। তারা লড়েছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, লড়েছে নোংরা প্রশাসনিক জটিলতার বিরুদ্ধে, লড়েছে নিজেদের আত্মসম্মান আর অধিকার আদায়ের জন্য।

তারা মাঠে হেরে যায়নি, বরং জয় করেছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন। আর এই বিশ্বকাপে যখন এক দেশ তাদের জন্য অমানবিক দেয়াল তুলে দিয়েছিল, তখন প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো পরম মমতায় দুই হাত বাড়িয়ে তাদের আগলে রেখেছিল।

ট্রফি হয়তো দলটি পায়নি ইরান, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অপরাজিত এক কান্নার কাব্য হয়ে অমর হয়ে রইল দলটি। তাদের এই বীরত্বগাথা ফুটবলপ্রেমীরা বহু বছর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।