‘আমাদের সময় শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। শিক্ষকরা নাম ধরে চিনতেন। এখন শিক্ষকরা ক্লাসে পাঠদানে অমনোযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিংমুখী হচ্ছে, ফলে সেই অম্ল-মধুর সম্পর্কটা আর নেই। এই অবস্থা অধিকাংশ বিদ্যালয়েই।'- আবেগের সুরে কথাগুলো বলেন রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পাবনা জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ফাহিমুল ইসলাম শোভন।

বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বী, স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাইয়িদ কিংবা প্রখ্যাত সাংবাদিক কামাল লোহানীর মতো কীর্তিমানের শৈশবের স্মৃতিধন্য প্রতিষ্ঠান পাবনা জিলা স্কুল। প্রতিষ্ঠার প্রায় পৌনে দুই শতক পেরিয়ে সগৌরবে দেশ-বিদেশে নিজের নাম টিকিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে ভেতরে তীব্র সংকটে ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ। প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষায় কাগজ-কলমের ফলাফল ভালো করলেও অবকাঠামোগত ও শিক্ষক সংকট, অচল কম্পিউটার ল্যাব এবং শ্রেণিকক্ষে গুণগত পাঠদানের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থী এখন পুরোপুরি ‘কোচিং-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

স্কুল-কলেজে ঠিকমতো না পড়ানোয় কোচিং সেন্টার গড়ে ওঠে: শিক্ষামন্ত্রী

অতীত অর্জন ও গৌরব গাঁথা

পাবনা জিলা স্কুলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি শুরু থেকেই মেধার দিক থেকে অবিভক্ত বাংলা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এন্ট্রান্স পরীক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বারবার মেধা তালিকায় শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে।

যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনন্য। স্কুলের তৎকালীন শিক্ষক শহীদ মাওলানা কছিমুদ্দিন স্কুলের স্কাউট দলের বন্দুক দিয়ে তার তৎকালীন ও সাবেক ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেন। বিজ্ঞান ল্যাবের কেমিক্যাল দিয়ে অভিনব বিস্ফোরক তৈরির কৌশলও শেখান। এসবের জেরে তৎকালীন রাজাকার ও পাকিস্তান বাহিনীরা তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। স্কুলের তৎকালীন বহু ছাত্র সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, যাদের অনেকেই দেশের জন্য শহীদ হন।

‘স্কুলের নামের ওপর ভরসা করে সন্তানকে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু ক্লাসে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। বাধ্য হয়ে প্রায় প্রতিটি বিষয়েই আলাদা করে কোচিং বা প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’

শুধু পড়াশোনাই নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পাবনা জিলা স্কুলের অতীত অর্জন ঈর্ষণীয়। পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পর জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিকস, ক্রিকেট ও ফুটবল প্রতিযোগিতায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বহু ট্রফি ও গৌরব বয়ে এনেছে। এছাড়া জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞান মেলাগুলোতে এই স্কুলের দাপট ছিল চিরচেনা।

এমনকি এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তনরা আজ দেশ-বিদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। বর্তমান নৌবাহিনী প্রধানসহ দেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, বুয়েট-মেডিকেলের শীর্ষস্থানীয় অধ্যাপক, সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা, নামকরা চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং বুধিজীবীদের একটি বিশাল অংশ এই স্কুলেরই প্রাক্তন।

ধারাবাহিক সফলতা

একাডেমিক ফলাফলে বরাবরের মতোই পাবনা জিলা স্কুলের নাম শীর্ষে। প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে শতভাগ পাস ও অধিকাংশ জিপিএ-৫ নিয়ে গৌরব ধরে রাখে। ২০২২ সালের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৫২ জন। এরমধ্যে ২৩৫ জনই জিপিএ-৫ অর্জন করে। একইভাবে ২০২৩ সালে ২৪৭ জনের মধ্যে ১৮০, ২০২৪ সালে ২৪০ জনের মধ্যে ১৯০ ও ২০২৫ সালে ২৩৭ জনের মধ্যে ১৪৭ জন জিপিএ-৫ অর্জন করে। অর্থাৎ এই চার বছরের ফলাফলও বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ভালো ফলাফল অর্জন রয়েছে চলতি বছরের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায়। চলতি বছর ৯৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে বৃত্তি পেয়েছে ৭৮ শিক্ষার্থী। তবে সচেতন মহল ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মতে, বিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্যের তুলনায় এই অর্জন সন্তোষজনক নয়।

‘শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় অনেকেই ক্লাসে আসে না। সবাই এলে বসার সমস্যা হয়।’

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ব্যাপক নামডাক ও ঐতিহ্য থাকলেও আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওই অর্থে এগোয়নি বিদ্যালয়টির শিক্ষার গুণগত মান। বরং আধুনিক অবকাঠামোর অভাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং শ্রেণিকক্ষে গুণগত ও ব্যবহারিক শিক্ষার সংকট প্রবল। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত ও সঠিক মানের শিক্ষার অভাবে এখানকার সিংহভাগ শিক্ষার্থীই এখন পুরোপুরি ‘কোচিং-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে। রয়েছে নানা সংকট।

আরও পড়ুন

শিক্ষা আইনের খসড়া / কোচিং ও নোট-গাইড স্থায়ীভাবে বন্ধে বিধিমালা করছে সরকার

ক্লাসরুম, শিক্ষক ও স্যানিটেশন সংকট

১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারি বিদ্যালয়ে দুই শিফটে বর্তমানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতি শিফটে প্রতিটি শ্রেণির দুটি করে শাখা চলে, যেখানে প্রতি শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। সব ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত হলে প্রতি বেঞ্চে ৪-৫ জন করে গাদাগাদি করে বসতে হয়।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারুফ জানায়, ‘শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় অনেকেই ক্লাসে আসে না। সবাই এলে বসার সমস্যা হয়।’

যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট

শিক্ষার্থী বাড়লেও বাড়েনি শিক্ষকের সংখ্যা। ২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র ৫০ জন। অর্থাৎ প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ১ জন শিক্ষক। ফলে ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকরাও ক্লান্ত।

জীববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দিনে আমাদের ৪-৫টি বা তারও বেশি ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষকের সংখ্যা না বাড়লে এই মানসিক ও শারীরিক চাপ কমানো অসম্ভব।’

‘দিনে আমাদের ৪-৫টি বা তারও বেশি ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষকের সংখ্যা না বাড়লে এই মানসিক ও শারীরিক চাপ কমানো অসম্ভব।’

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে তীব্র স্যানিটেশন সমস্যা। প্রতি শিফটে সহস্রাধিক ছাত্রের জন্য মাত্র ৮-১০টি ওয়াশরুম রয়েছে, যার পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা।

‘স্মার্ট’ শিক্ষার ছোঁয়া নেই, ল্যাব-লাইব্রেরি সব অচল

দেশজুড়ে যখন ‘স্মার্ট শিক্ষা’ ও ডিজিটাল ক্লাসরুমের কথা বলা হচ্ছে, তখন পাবনা জিলা স্কুলে কোনো স্মার্ট বোর্ড বা ডিজিটাল ক্লাসরুমের অস্তিত্বই নেই। বিদ্যালয়ের একমাত্র কম্পিউটার ল্যাবটির ২০-২৫টি কম্পিউটারের প্রায় সবগুলোই গত কয়েক বছর ধরে নষ্ট। বর্তমানে সচল আছে মাত্র ২টি কম্পিউটার। এমনকি বিদ্যালয়ে নেই কোনো কম্পিউটার শিক্ষকের পদ। হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেনসহ তিনজন শিক্ষক নিজ বিষয়ের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে খুড়িয়ে খুড়িয়ে ল্যাবটি চালাচ্ছেন। এতে প্রয়োজনীয় হারে মিলছে না ব্যবহারিক শিক্ষা। একই দশা লাইব্রেরি ও ছাত্রাবাসের। বিদ্যালয়ে কোনো লাইব্রেরিয়ান নেই, একজন শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে এটি চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের থাকার একমাত্র অবলম্বন স্কুলের আবাসিক ছাত্রাবাসটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

আরও পড়ুন

ইট-পাথরের শহরে শিশুদের জন্য এক টুকরো সবুজ ক্যাম্পাস

ক্ষোভ ও হতাশা

শিক্ষার মানোন্নয়ন বা সহ-শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারি যে বাজেট আসে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আবার যে সামান্য বরাদ্দ আসে, তার স্বচ্ছতা ও সঠিক ব্যবহার নিয়েও শিক্ষার্থীদের মনে সংশয় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্কুলের নামের ওপর ভরসা করে সন্তানকে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু ক্লাসে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। বাধ্য হয়ে প্রায় প্রতিটি বিষয়েই আলাদা করে কোচিং বা প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদ্যালয় যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতো, তাহলে কোচিংয়ের পেছনে দৌড়াতে হতো না।’

বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী জামিউল হাসান সোহান বলেন, ‘এত বছর পেরিয়ে গেলেও স্কুলটি আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ কোচিং-নির্ভর হয়ে পড়ছে।’

সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক রিজভী জয় বলেন, ‘লটারি পদ্ধতির কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ছিটকে পড়ছে এবং যারা আসছে তারা জিলা স্কুলের ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। পাশাপাশি শিক্ষকরাও ক্লাসে সেরাটা দিচ্ছেন না।’

যে মাঠে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন সেখানে আজ কেবলই সংকট

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কোচিং নির্ভরতার অভিযোগ অস্বীকার করে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আকতার উজ জামান বলেন, ‘কোচিং নির্ভরতার বিষয়টি ঢালাওভাবে সঠিক নয়। ক্লাসে শিক্ষকরা যথেষ্ট মানসম্পন্ন পাঠদান করেন এবং তা কড়া নজরদারিতে রাখা হয়। সে কারণেই আমাদের ছাত্ররা এখনো ভালো করছে।’

অবকাঠামোগত সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সংকট ছিল ক্লাসরুমের। আগামী মার্চ মাসেই ৬ তলা আধুনিক ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হচ্ছে। সেখানে স্মার্ট ল্যাব ও আধুনিক ক্লাসরুমের সুবিধা থাকবে। এতে অধিকাংশ সংকট কেটে যাবে। এখন শুধু শিক্ষক সংকট কাটলেই আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব।’

আরও পড়ুন

চার বছর ধরে ঝুলে আছে ২৩ কোটি টাকার স্কুল ভবনের নির্মাণ কাজ

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের ফলাফল ভালো। বৃত্তি পরীক্ষাতেও ভালো করেছে। নতুন বিল্ডিং পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো কেটে যাবে। আর যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়টিতে নজরদারি বাড়ানো হবে।

এফএ/এএসএম