শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক থেকে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের লিভারপুলে বেড়ে উঠেছেন। বর্ণবাদ ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই-সব বাধা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন আলি আল-হামাদি। ইরাকের এই স্ট্রাইকারের গল্প ফুটবলের বাইরে সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির। আজ সেনেগালের বিপক্ষে রাত ১টায় শুরু হওয়া ম্যাচে ইরাকের নকআউট স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে।
২৪ বছর বয়সি আল-হামাদি ২০২৪ সালে ইপসউইচ টাউনের হয়ে মাঠে নেমে প্রথম ইরাকি ফুটবলার হিসাবে প্রিমিয়ার লিগে ইতিহাস গড়েন। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে হারলেও তার লড়াকু মানসিকতা সবার নজর কাড়ে। আল-হামাদির বাবা ইব্রাহিম আল-হামাদি ছিলেন সাবেক ইরাকি শাসক সাদ্দাম হোসেনের বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মী। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় মাত্র এক বছর বয়সি আলিকে নিয়ে তার মা আশ্রয় নেন জর্ডানে। আল হামাদি বলেছিলেন, ‘কারাগার থেকে যুক্তরাজ্যে ইরাকি দূতাবাসে চিঠি লিখে নিজেদের পরিস্থিতি জানানো হয়। পরে মুক্তি পেয়ে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে চলে যেতে হয়।’
যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেলেও জীবন সহজ হয়নি। লিভারপুলের টক্সটেথ এলাকায় দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে তার শৈশব। অনেকদিন গেছে ঘরে খাবারও ছিল না। ২০২৩ সালে দ্য এশিয়ান গেমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘স্কুলে আমাকে বর্ণবাদী কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে। ফুটবলের একাডেমি পর্যায়ের ম্যাচগুলোতেও অনেক অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মেনে নিয়েছিলাম যে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারব না। নিজের উন্নতি এবং নিজের পথ তৈরি করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছি। টক্সটেথ এলাকায় অনেক তরুণ মাদক ও সহিংসতার চক্রে জড়িয়ে পড়ে। আমিও কয়েকবার সেই পথে পা বাড়ানোর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। তবে নিজেকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।’
ফুটবলই হয়ে ওঠে তার মুক্তির পথ। রাস্তায় দুটি জাম্পার গোলপোস্ট বানিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলতেন। রূঢ় বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন দেখতেন ফুটবলের মধ্য দিয়ে। আল-হামাদির ভাষায়, ‘আমার পরিবারের ত্যাগ আর সংগ্রাম আমাকে আলাদা শক্তি দেয়। আমাকে আরও ক্ষুধার্ত ও দৃঢ় করে। সেই স্মৃতি সব সময় আমার সঙ্গে থাকে।’ সেই স্বপ্নই আজ আল হামাদিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফে বলিভিয়ার বিপক্ষে ইরাকের ২-১ গোলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন তিনি। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বকাপের আলোয় উঠে আসা আলি আল-হামাদি এখন নতুন স্বপ্ন দেখছেন।








