সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁরা। অভাবের সংসারে কষ্ট সহ্য করে পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন, আলাদা সংসার গুছিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই বাবা-মায়ের ঠাঁই হয়েছে দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর অবহেলার মধ্যে। এখন দুবেলা খাবারের জন্যও প্রতিবেশীদের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁদের।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামের বাসিন্দা ৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তাঁর ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগমের জীবনের গল্প যেন সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

বয়সের ভারে আছাব আলী চলাফেরার শক্তি প্রায় হারিয়েছেন। নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন না। দৈনন্দিন কাজকর্মও অন্যের সাহায্য ছাড়া করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন সালেকা বেগম। নিজের অসুস্থতা ভুলে প্রতিদিন স্বামীর সেবাযত্নে ব্যস্ত থাকেন। কখনো স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যান, আবার কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।

তাঁদের ছোট্ট বসতঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র। জরাজীর্ণ টিনের ছাউনি, ছিদ্রযুক্ত বেড়া। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। নেই নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ, নেই ভালো শৌচাগার কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। একটি ভালো খাটও জোটেনি তাঁদের ভাগ্যে। বাঁশের তৈরি একটি মাচার ওপর চট বিছিয়ে কোনোভাবে রাত কাটান এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভার আর অসুস্থতার যন্ত্রণায় প্রতিটি রাত যেন তাঁদের কাছে দীর্ঘশ্বাসের আরেকটি অধ্যায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন আছাব আলী। অনেক কষ্টে সবাইকে বড় করেছেন, সংসার গুছিয়ে দিয়েছেন। অথচ এখন জীবনের শেষ সময়ে এসে সেই সন্তানদের অধিকাংশই বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না। তাঁদের সন্তানেরা কেউ রিকশা চালান আবার কেউবা তাঁতশ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে বিয়ের পর সবাই যে যাঁর মতো করে আলাদা হয়ে গেছেন। থাকেন শ্বশুরবাড়িতেই। 

৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তাঁর ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগম বলেন, খাওয়াদাওয়ায় খুব কষ্ট। সন্তানেরা থেকেও নেই। প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতায় কোনোমতে টেনেটুনে চলে।

প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম বলেন, ‘চাচা-চাচির এই কষ্ট দেখতে খুব খারাপ লাগে। যার যা সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই আমরা সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলবে? জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের পাশে সমাজের সবার দাঁড়ানো উচিত।’

আরেক প্রতিবেশী কামাল শেখের ভাষায়, এত ছেলেমেয়ে থাকার পরও বাবা-মায়ের এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। এই বয়সে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্ন। কিন্তু তাঁরা পেয়েছেন শুধু অবহেলা।

ভদ্রঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হয়।

সোহাগ মণ্ডল আরও জানান, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো ১০ জন সন্তান থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে তাঁদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি তাঁদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে জীবনের শেষ সময়টুকু তাঁরা অন্তত সম্মান আর স্বস্তির সঙ্গে কাটাতে পারবেন।